দুপুরে হঠাৎ চোখে পড়ল একখানা বই। নাম দেখে মনটা নাচ উঠলো উল্টে পাল্টে দেখে পড়া শুরু করলাম । মৌমাছির জীবনচক্র! বেশ মজার । কৌতুহল জাগলো প্রবল ।
পশুপাখিক জীবন নিয়ে পড়া আমার পুরনো রোগ। ওরা কত বছর বাঁচে, ওদের সমাজ কেমন চলে, কে নেতৃত্ব দেয়, কে কার দায়িত্ব নেয়, ওরা একে অন্যের সঙ্গে কীভাবে কথা বলে এসব পড়লে আমার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়।
এই রোগটা অবশ্য ছোট মেয়ের কাছ থেকেই ছোঁয়াচে লেগেছে। ও পশুপাখিদের জীবন নিয়ে পড়ে, আর জানে এসব নিয়ে এলে আমি বরাবর কান পেতে শুনি। তাই ওর পড়া গল্পগুলো এক-এক করে আমার কাছেও এসে পৌঁছায়। আজকের বইটা অবশ্য নিজের হাতেই পেলাম। ভাবলাম জানা যাক, এই ছোট্ট প্রাণীরা কীভাবে সংসার চালায়!
.png)
পড়তে পড়তে বেশ লাগছিল। হঠাৎ পুরুষ মৌমাছির জীবনটা চোখে পড়তেই আমি প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে গেছি! হাসতে হাসতে।
পুরুষ মৌমাছির কাজ কী? অনেকেই জানে না । ওরা মধু আনে না। চাক বানায় না। পাহারা দেয় না। খাবার জোগাড় করে না। কর্মী মৌমাছিরাই ওকে মুখে মুখে খাইয়ে দেয়। ওর জীবনের একটাই প্রধান দায়িত্ব রাণী মৌমাছির সঙ্গে মিলিত হওয়া।
বই বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলাম
বাহ! প্রকৃতি তো পুরুষদের জন্যও বড় কড়া নিয়ম লিখে রেখেছে!
মিলনমৌসুমে পুরুষ মৌমাছিরা এক নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো হয়।
রাণী আসেন।
সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নেন।
তারপর বেছে নেন নিজের পছন্দমতো একজনকে।
মনে মনে ভাবলাম হাজার পুরুষের ভিড়ে রাণীর ওই এক চোখ বুলোনোই ওদের ভাগ্য লেখে!
ওখানে কোনো পুরুষ এগিয়ে এসে বলে না আমাকে নিলেন না কেন ? কেউ বলে না আমার পরিচয়টা জানেন তো?
কেউ গলা ফুলিয়ে বলে না আমার কিন্তু অনেক ক্ষমতা! রাণী যাকে চান, তাকেই চান। ব্যস। আর মিলনের পর?
পুরুষ মৌমাছির জীবন সেখানেই শেষ।
বই বন্ধ করে আমি বোধহয় দশ মিনিট শূন্য দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
ভাবছিলাম।
আহা! মানুষের সমাজেও যদি প্রকৃতির এই একটু নিয়ম থাকত! বিশেষ করে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে!
যে পুরুষ মনে করে নারী তার সম্পত্তি,
যে নারীর না কেও নিজের অপমান ভাবে,
যে ক্ষমতা পেলেই অন্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায়,
যে অন্যায় করে বলে পুরুষ মানুষ, এমন একটু হতেই পারে ।
ওদের জন্য যদি প্রকৃতি রাখত আলাদা একটা পুরুষ জবাবদিহি সভা!
সপ্তাহে একদিন দুপুরবেলা সবাইকে ডাকা হতো আচ্ছা ভাই, এবার জীবনের হিসাবটা দিন তো।
সংসারে আসলেই কী করেছেন?
স্ত্রীর সিদ্ধান্তকে কতবার সম্মান করেছেন?
নিজের ভুল কতবার স্বীকার করেছেন?
ক্ষমতা পেয়ে কত মানুষকে ছোট করেছেন?কতবার না শুনেও নিজের ইচ্ছেটাকে বড় করেছেন?সব শুনে প্রকৃতি খাতা মেলত ঠিক আছে ভাই। সব লেখা আছে।
সেদিন আর কোনো তদবির চলত না।
কোনো বড় ভাই নেই। কোনো প্রভাবশালী বন্ধু নেই। কোনো ও ছেলেটা আসলে খুব ভালো বলে সাফাই সার্টিফিকেট নেই।
শুধু একটাই আইন
যেমন কাজ, তেমন ফল।
মৌমাছিদের জীবন পড়ে আজ এতটুকুই বুঝলাম। প্রকৃতি কখনো শুধু জীবন দেয় না, জীবনের সঙ্গে নিয়মও দেয়। আমরাই মানুষ হয়ে মাঝে মাঝে নিয়মটা নিজের সুবিধামতো লিখে নিই।
তারপর তার নাম দিই পুরুষত্ব। তাই আজকের মৌমাছি-শিক্ষা রাণীর আছে পছন্দের স্বাধীনতা। কর্মীর আছে পরিশ্রমের মর্যাদা।পুরুষেরও আছে দায়িত্ব। আর সবার ওপরে আছে জবাবদিহি।
মৌমাছির চাকটা ছোট, হলেও মিষ্টি দিয়ে জীবন গড়া হলেও তাদের
নিয়ম কানুন খুব স্পষ্ট।
মানুষের সমাজটা বড়, কিন্তু নিয়ম সেখানে মাঝে মাঝে ভীষণ ঘোলা।
সত্যি বলতে আমাদের সবারই একটু মৌমাছিদের কাছ থেকে 'সামাজিক বিজ্ঞান' পড়া দরকার!