গণতন্ত্রকামী বিশ্বে গণতন্ত্রের নীরব কান্না!
বলা হয়ে থাকে, মানুষের কথা বলার অধিকারও গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। তবে বর্তমান সময়ে কথা বলার অধিকারকে বলা হয় প্রথম এবং প্রধান গণতান্ত্রিক অধিকার। কেননা, গণতন্ত্র হলো প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় নাগরিকের মৌলিক সম্মান ও অধিকারের প্রতিফলন।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার থাকে সুনিশ্চিত। মানুষের ছয়টি মৌলিক মানবিক অধিকার একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য আবশ্যক। আরো বলঅ হয়ে থাকে, অন্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদন এই ছয়টি মৌলিক মানবিক অধিকার যেসব দেশে সুনিশ্চিতভাবে আছে সেসব দেশকেই বলা হয় গণতান্ত্রিক দেশ।
কিন্তু গণতন্ত্রের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। কারণ গণতন্ত্র পাওয়ার জন্য প্রতিটি দেশকেই রক্ত ঝরাতে হয়েছে। জীবন দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে এই গণতন্ত্র নামক বস্তুটি। ইতিহাস পর্যালেঅচনা করলে দেখা যাবে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ তারাও রক্ত ঝরিয়েছে, জীবন দিয়েছে। ইতিহাস বলে- গণতন্ত্রের স্বাদ গ্রহণ আর রক্ত ঝরানো যেন একে অন্যের পরিপূরক।
.png)
যে দেশগুলো গণতন্ত্রের ক্ষয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তাদের সেই অভিজ্ঞতার নির্দিষ্ট দিকগুলোর বিষয় বিবেচনায় রাখলেও গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রার কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। মানে গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্রে গণতন্ত্র পিছিয়ে যাচ্ছে!
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে জাতিসংঘের মূল প্রতিপাদ্য হলো: ("Raising Hands and Voices – Fostering Agency and Ownership through Deliberative Democracy") হাত ও কণ্ঠস্বর তোলা – আলোচনামূলক বা deliberative গণতন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিক সক্ষমতা ও মালিকানা বৃদ্ধি করা।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূলত ১৯৮৭ সালে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বেগবান করতে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৯৭ সালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের গৃহীত ‘গণতন্ত্র সংক্রান্ত সার্বজনীন ঘোষণা’ স্মরণে রাখতে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বের প্রতিটি দেশে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষা করা গণতন্ত্রের অবস্থা মূল্যায়ন করা, মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর আব্রাহাম লিঙ্কন পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দেওয়া একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। যে ভাষণের সময় ছিল মাত্র ২ মিনিট। সেই ২ মিনিটের ২৭২ শব্দের ভাষণে তিনি ইতিহাসের স্মরণীয় সেই বক্তব্যটি রেখেছিলেন, যা হল-
‘ডেমোক্রেসি ইজ অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল ফর দ্য পিপল’। অর্থাৎ গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য।
গণতন্ত্রের কোনও একটি নির্দিষ্ট মডেল নেই এবং গণতন্ত্র কোনও দেশকাল গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। গণতন্ত্র হল জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইচ্ছা বা মত প্রকাশের অধিকার। ইত্যাকার নানান কারণে-অকারণে যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।
আবার অনেক দেশে গণতন্ত্রের ঘোমটায় মুড়ি দিয়ে চলছে কর্তৃত্ববাদ। কোনো কোনো দেশে তো বলেকয়েই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বাতিল করেছে। দিনের পর দিন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে মানুষের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরানোর প্রবণতা সৃষ্টির শুরু হয়েছে অনেক দেশে।
বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৬ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতকে এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। ভারতে নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের অব্যাহত প্রচেষ্টা হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, জনসাধারণের ভেতরে বিভক্তি তৈরি, বিষাক্ত মেরুকরণের পথ তৈরি করা!
শুধু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নয়, প্রথম বিশ্বের দেশে দেশেও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম হয়েছে। আন্দোলন হয়েছে। রক্তপাত হয়েছে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একেকটি গণতান্ত্রিক দেশ অর্জন করেছে বহু আকাঙ্খিত গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্র এখন কোথায়!
আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ফিলিপস হান্টিংটন তার বিখ্যাত ‘দ্য থার্ড ওয়েভ : ডেমোক্রেটাইজেশন ইন দ্য লেট টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ বইয়ে আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের তিনটি জোয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম জোয়ারটি ছিল ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত।
শতবছরের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিশ্বের ২৯ দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর গণতন্ত্রের ভাটার সময় ছিল।
তখন কোথাও ফ্যাসিজমের আবার কোথাও কমিউনিজমের বিকাশ হয়েছে। গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জোয়ার শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যৌথবাহিনীর বিজয়ের পর। তখন বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায়ে ছিল ৩৬।
১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আবার গণতান্ত্রিক ধারায় নিম্নগামী দেখা যায়। এ সময় প্রভাব বিস্তার করে কমিউনিস্ট শাসিত সমাজতান্ত্রিক সরকার।
হান্টিংটনের মতে, গণতন্ত্রের শেষ জোয়ারটি ছিল ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত, এ সময়ে দক্ষিণ ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২।
গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি হলো এটি গুণের চেয়ে সংখ্যাকে প্রাধান্য দেয়। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে গণতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, একটি জাহাজ চালানোর দায়িত্ব যেমন অভিজ্ঞ নাবিকের ওপর থাকা উচিত, রাষ্ট্রের দায়িত্বও তেমনি থাকা উচিত প্রজ্ঞাবান দার্শনিকদের হাতে। কিন্তু গণতন্ত্রে বিশেষজ্ঞের মত আর সাধারণ আবেগপ্রবণ মানুষের মতের মূল্য সমান।
নির্বাচনে জেতার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান নয়, বরং জনতাকে আবেগপ্রবণ করার ক্ষমতা (Demagoguery বা জনতুষ্টিবাদ) বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদের চেয়ে একজন সুবক্তা ও পপুলিস্ট নেতা বেশি ভোট পান।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের নীতি প্রচার ও সুসংহত করার উদ্দেশ্যে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। এই দিবসের গুরুত্ব মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র এমন একটি পরিবেশ তৈরী করে যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সেবা ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সচেষ্ট হয়। গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোন স্বৈরশক্তিই মাথাচাড়া দিতে পারে না, আর-সে কারণে জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করা সম্ভব হয় না।
গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই শেষ কথা। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক হয় না। জন স্টুয়ার্ট মিল একে বলেছিলেন “Tyranny of the Majority” বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোনো ভুল বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, তবে গণতন্ত্র তাকেই বৈধতা দেয়।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে ম্যানিপুলেট করা যতটা সহজ হয়েছে, তাতে ‘জনমত’ অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সহজ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন- গণতন্ত্রকে সচল রাখতে হলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র সম্ভব নয়।
এখন আমাদের মনে রাখতে হবে- উইনস্টন চার্চিল-এর সেই কথাটি, তিনি একবার বলেছিলেন, “গণতন্ত্র হলো নিকৃষ্টতম শাসনব্যবস্থা, তবে অন্য যেসব ব্যবস্থা এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে, সেগুলোর চেয়ে এটি উন্নত।” অর্থাৎ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা যা ক্রমাগত সংশোধনের দাবি রাখে। একে পবিত্র ও অভ্রান্ত মনে না করে বরং এর ভেতরে মেধাতন্ত্রের (Meritocracy) সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এটি বারবার ব্যর্থ হতে বাধ্য।