“প্রথমদিকে সবাই ভেবেছিল যে, এই মহামারী পূর্বের মহামারীগুলোর মতো, যেখানে ধর্ম প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু যখন তারা নিজেদের অনিবার্য ও তাৎক্ষণিক ধ্বংস বুঝতে পারল, তখন তারা চিন্তাভাবনাকে ভোগবিলাসের দিকে ধাবিত করল। ফলে, দিনের বেলায় যে অসহ্য ভয় তাদের মুখে ছাপ ফেলে রাখত, সেগুলো জ্বলন্ত ধূলিময় দিনের শেষে একধরণের অস্থির উল্লাসে রূপান্তরিত হলো। এক ধরণের স্বাধীনতার জয়োল্লাস তাদের রক্তের ভেতরে খেলা করতে লাগল। “আমি তো অন্যদের চেয়ে আলাদা নই। কাজেই মৃত্যু তাদেরকে ভীত না করলে আমাকে করবে কেনো? ঘটনাই নির্ধারন করে দেয় কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক। ত্যারু নিজেই রিওকে অনুরোধ করেছিল সেই সাক্ষাৎকারটির জন্যে যা সে তার ডায়রিতে উল্লেখ করেছে। সেদিন বিকেলে ত্যারুর আগমনের পূর্বে রিও তার মা’র দিকে তাকিয়েছিল, যিনি স্থির হয়ে ডাইনিং রুমের কোণে বসেছিলেন। গৃহস্থালির কাজ শেষ করার পর তিনি বেশিরভাগ সময় এই চেয়ারে বসেই কাটিয়ে দেন। তার হাতগুলো কোলের উপরে ভাঁজ করা ছিল। তিনি অপেক্ষা করছিলেন। রিও নিশ্চিত নয় যে, তিনি তার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন কিনা। তবে, রিও বাসায় প্রবেশ করার সময়ে তার মায়ের মুখে কিছু একটা পরিবর্তন হয়ে থাকে। সম্ভবত কষ্টকর জীবন হতে নিষ্কৃতি হঠাত একটা উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করে এবং তিনি প্রশান্ত অবস্থায় ফিরে আসেন। সেই বিকেলে তিনি জানালা দিয়ে বাইরের খালি রাস্তার দিকে তাকিয়েছিলেন। শহরের রাস্তার বাতিগুলোর সংখ্যা দুই তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বেশ দূরে একটা বাতি শহরের ঘন অন্ধকারের ভেতরে মিটমিট করে জ্বলছিল।
“প্লেগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কি বাতির সংখ্যা কমই থাকবে?” ম্যাডাম রিও জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার মনে হয় তাই।”
“আশা করি যে, প্লেগ যেন শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী না হয়। সেটা খুবই হতাশার হবে।”
“হ্যা,” রিও বলল।
সে দেখল মা তার কপালের দিকে তাকিয়ে আছেন। সে জানত যে, গত কয়েকদিনের উদ্বিগ্নতা ও অতিরিক্ত কাজের চাপ সেখানে ছাপ ফেলে গেছে।
“আজকের খবর কি? তার মা জিজ্ঞেস করল।
“আগের মতোই।”
আগের মতোই! প্যারিস থেকে সিরামের যে চালানটি পাঠানো হয়েছে, সেটির কার্যকারীতা আগের চেয়ে কম হওয়ায় মৃত্যুর হার বাড়ছিল। আক্রান্ত পরিবারগুলো ছাড়া অন্যদেরকে প্রতিষেধক টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সবাইকে দেওয়ার জন্যে অনেক বেশী পরিমাণে টিকার প্রয়োজন। বেশিরভাগ ফোঁড়াগুলোই ফাটছিল না। মনে হচ্ছিল এগুলো সময়ের সাথে শক্ত হয়ে যাচ্ছিল। ফলে আক্রান্তরা খুবই কষ্ট পাচ্ছিল। গত ২৪ ঘন্টায় দুইজন রোগী পাওয়া গেছে, যারা নতুন ধরণের মহামারী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। প্লেগ ক্রমশ নিউমোনিয়ায় পরিণত হচ্ছে। এ’দিন মিটিং এর সময়ে ডাক্তাররা নগরপ্রধানকে চাপ দিলো নতুন নির্দেশাবলী প্রদানের জন্যে। যাতে সংক্রমণ মুখ থেকে মুখে ছড়াতে না পারে। এটা সাধারণত ঘটে থাকে নিউমোনিক-প্লেগের ক্ষেত্রে। নগরপ্রধানকে দেখে মনে হচ্ছিল তার বুদ্ধিতে কুলাচ্ছে না তিনি কী করবেন। শেষ পর্যন্ত নগরপ্রধান ডাক্তারদের ইচ্ছানুযায়ীই নির্দেশিকা প্রদান করলেন।
মা’র দিকে তাকিয়ে রিও’র ভেতরে প্রায় ভুলে যাওয়া একটি আবেগ উত্থিত হলো। বালককালের ভালোবাসা। মায়ের চোখের কোমল বাদামী দৃষ্টি তার এই অনুভূতিকে উশকে দিলো।
“তুমি কি কখনই ভয় পাও না, মা?”
“আমার এই বয়সে ভয় পাওয়ার আর কিছু নেই।”
“দিনগুলো খুবই লম্বা, এবং আমি খুব কম সময়েই আমি ঠিক সময়ে বাড়িতে ফিরতে পারি।”
“অপেক্ষা করতে আমার খারাপ লাগে না, যদি আমি জানি যে তুমি ফিরে আসবে। এবং যখন তুমি এখানে থাকো না, তখন আমি চিন্তা করি তুমি কী করছ। তোমার কি কোনো খবর আছে? ”
“হ্যা, আমি যদি তার শেষ টেলিগ্রামকে বিশ্বাস করি, তাহলে সবকিছুই ঠিক মতো চলছে। কিন্তু আমি জানি যে, সে আমাকে তা বলে শুধুমাত্র আমি যাতে চিন্তা না করি।”
দরজার বেল বাজল। ডাক্তার মা’র দিকে মৃদু হেসে দরজা খুলতে গেল। দরজার সামনে প্রায়ান্ধকারে ত্যারুকে দেখে মন হচ্ছিল তার বাদামী দাঁড়ি আছে। রিও তার অতিথিকে বসতে দিলো তার ডেস্কের মুখোমুখি। নিজে সে দাঁড়িয়ে থাকল ডেস্ক চেয়ারটির পেছনে। তাদের দুজনের মাঝখানে ছিল রুমের একমাত্র বাতিটি। একটি ডেস্ক ল্যাম্প। ত্যারু সরাসরি তার আলোচনার বিষয়ে আসলো। “আমি জানি বিষয়টা নিয়ে আমি তোমার সাথে মনখুলে কথা বলতে পারি।”
রিও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“আগামী পনেরদিন বা সবচেয়ে বেশী একমাস পর্যন্ত তুমি কিছুই করতে পারবে না। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
“আমি স্বীকার করি।”
“স্বাস্থ্য বিভাগ খুবই অদক্ষ। তাদের জনবলও কম। ফলে সারাদিনরাত তোমাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করতে হচ্ছে।”
রিও স্বীকার করল যে, এটাও ঠিক।
“ঠিক আছে। আমি শুনেছি যে, কর্তৃপক্ষ জনসাধারণ থেকে কিছু মানুষকে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এদের সবাইকে স্বাস্থ্যবান হতে হবে। এদেরকে দরকার প্লেগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে।”
“তুমি যা শুনেছ, তা সঠিক। তবে নগরপ্রধান এখন পর্যন্ত এবিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।”
“ তিনি যদি নিয়োগ দিতে ভয় পান, তাহলে স্বেচ্ছাসেবকদেরকেও ডাকতে পারেন।
“সেটা করা হয়েছিল। খুব কম সাড়া পাওয়া গেছে।”
“সেটা করা হয়েছিল অফিশিয়াল চ্যানেলের মাধ্যমে এবং অনাগ্রহসহকারে। যে জিনিসটা তাদের কমতি আছে তা হলো কল্পনা করার ক্ষমতা। আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। যে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা তারা চিন্তা করতে সক্ষম, তা সাধারন- ঠান্ডার রোগীদের জন্যেও যথেষ্ট নয়। তাদেরকে যদি আমরা এভাবে চলতে দিই, তাহলে খুব তাড়াতাড়িই তারা মরে যাবে। সেই সাথে মরব আমরাও।”
“সেটা হবার সম্ভাবনাই বেশী,” রিও বলল। “যাই হোক, আমি যা জানি তা হলো, তারা চিন্তা করছেন জেলবন্দিদের এধরণের ভারী কাজে ব্যবহার করার জন্যে।”
“আমি মনে করি মুক্ত মানুষদেরকে নিয়োগ দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত হবে।”
“আমিও তাই মনে করি। কিন্তু আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, তুমি এই কাজ করতে চাও কেনো?”
“আমার চোখের সামনে মানুষেরা মরে যাচ্ছে, এটা আমি ঘৃণা করি।”
“রিও ত্যারু’র চোখের ভেতরে তাকাল।
“তাতে কি?” সে জিজ্ঞেস করল।
“আমার যা বলার তা আমি বলেছি। আমি পরিকল্পনা করেছি যে আমি একটি স্বেচ্ছাসেবকদল গড়ে তুলব। আমি আশা করি যে, এবিষয়ে তুমি আমাকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করবে। আমরা আমলাতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে যাব। এছাড়া কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই অনেক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। শহরের বিভিন্ন ধরণের মানুষদের মধ্যে আমার অনেক বন্ধু আছে। তাদেরকে নিয়ে শুরু করার জন্যে আমি একটি নিউক্লিয়াস গঠন করব। এবং অবশ্যই আমি এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করব।”
“বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, তোমার প্রস্তাব আমি সানন্দে গ্রহণ করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষকরে আমার কাজের জন্যে খুব বেশী সাহায্যকারী প্রয়োজন নেই। কর্তৃপক্ষ থেকে তোমার পরিকল্পনাকে অনুমোদন করিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি।”
“অবশ্য এক্ষেত্রে তাদেরও আর তেমন কোনো উপায় নেই। তবে আমি তোমাকে জানাতে চাই যে, এধরণের কাজ সাহায্যকারীর জন্যে মৃতুর কারণও হতে পারে। আমি মনে করি তোমাকে আমার এই প্রশ্নটি করা দরকার। তুমি কি এই বিপদকে বিবেচনায় নিয়েছ?”
ত্যারু খুব শান্তভাবে রিও’র দৃষ্টির পানে তাকাল।
.png)