“প্যানেলাক্সের ধর্মাপদেশ সম্পর্কে তোমার মতামত কী, ডাক্তার?” ত্যারু জিজ্ঞেস করল। প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক স্বরে ত্যারু তাকে জিজ্ঞেস করল। রিও’ও একই স্বরে উত্তর দিলো। “আমি দেখেছি যে, আমাদের হাসপাতালের অনেকেই সামষ্ঠিক শাস্তি (collective punishment) পছন্দ করে। তবে তুমি তো জানোই যে, খ্রিষ্টানরা প্রায়ই এধরনের কথাবার্তা বলে থাকে, চিন্তাভাবনা ছাড়াই। তবে আমার মতে কথাগুলো খুব বেশী অসত্য নয়।”
“যাই হোক, তুমি কি প্যানেলাক্সের মতো ভাবো যে, প্লেগের ভালোদিক হলো এটি মানুষের অন্তর্চক্ষুকে খুলে দিয়ে তাদেরকে চিন্তা করতে বাধ্য করে?”
ডাক্তার অস্থিরভাবে তার মাথা নাড়ল।
“প্রতিটা অশুভ ঘটনাই এমন প্রভাব ফেলে থাকে। পৃথিবীর সকল অশুভ ঘটনার মতো প্লেগের ক্ষেত্রেও তা সত্য। এই ঘটনাগুলো মানুষকে তাদের স্বত্বার উপরে উঠতে সাহায্য করে। ফলে তারা পাগল অথবা কাপুরুষ অথবা পাথরের মতো অন্ধে পরিণত হয়ে শান্তভাবে প্লেগের কাছে আত্নসমর্পন করতে পারে।”
কথাগুলো বলার সময়ে রিও কণ্ঠস্বরকে মোটেই উঁচু করল না। কিন্তু তারপরেও ত্যারু তাকে সামান্য একটু সঙ্কেত দিলো। তাকে কিছুটা শান্ত করার জন্যে। একটু মৃদু হাসলও সে।
“হ্যা,” রিও তার ঘাড় নাড়াল। “কিন্তু তুমি এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি। তুমি কি তোমার কাজের পরিণাম কি হবে, তা ভেবে দেখেছ?”
ট্যারু তার কাঁধকে চৌকোণ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। তারপর নিজের মাথাটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসলো আলোর মধ্যে।
“তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, ডাক্তার?”
এবারেও সে স্বাভাবিক স্বরেই তার প্রশ্ন করল। তবে এবার রিও প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় নিল।
“না। সত্যিকার অর্থে ঈশ্বর কী সেটাই আমি বুঝি না। আমি অন্ধকারের ভেতরে অসহায়ভাবে খুঁজেছি, সংগ্রাম করছি তাকে খুঁজে পাওয়ার। কিন্তু সেই মৌলিক সত্যকে আমি এখনও খুঁজে পাইনি।“
“এটাই কি তোমার আর পেনেলাক্সের ভেতরে পার্থক্য?”
“আমার মনে হয় না। প্যানেলাক্স একজন শিক্ষিত মানুষ ও পন্ডিত। তবে তিনি কখনই মৃত্যুর সংস্পর্শে আসেননি। একারণেই তিনি সত্য নিয়ে এমন জোরগলায় কথা বলতে পারেন। আমি মনে করি যেসকল ধর্মযাজকরা কোনো মানুষকে মৃত্যুশয্যায় নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে হাঁপাতে দেখেছেন, তারা আমার মতো ভাবেন। কারণ, ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের চেয়ে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষকে কষ্ট হতে মুক্তি দেওয়া।“ রিও উঠে দাঁড়াল। মুখটিকে ছায়ার ভেতরে রেখেই সে বলল, “আসো, আমরা এই বিষয়ে নিয়ে কথা বলা বন্ধ করি, যেহেতু তুমি এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি।”
ত্যারু চেয়ার থেকে উঠল না। পুনরায় হাসল।
“আমি যদি একটা প্রশ্নের মধ্যদিয়ে তোমার প্রশ্নের উত্তর করি?”
ডাক্তার এখন নিজেও হাসল।
“তুমি খুব রহস্য করতে ভালোবাস, তাই না? ঠিক আছে, প্রশ্ন করো।”
“আমার প্রশ্ন হলো,” ত্যারু বলল, “ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও তুমি কেমন করে এমন একনিষ্ঠভাবে কাজ করো? আমার ধারণা এবিষয়ে তোমার উত্তর আমাকে সাহায্য করবে।”
ছায়ার ভেতরে মুখ রেখেই রিও বলল যে, সে ইতিপূর্বেই তার উত্তর দিয়েছেঃ যদি সে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাস করত, তাহলে রোগীদের শুশ্রূষা করা থেকে সে বিরত থেকে ঈশ্বরের উপরেই সেই দায়িত্ব অর্পন করত। কিন্তু পৃথিবীর কেউই এমনভাবে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে না। এমনকি প্যানেলাক্সও করে না। এবং, অতীতে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, কেউ কখনই ঈশ্বরের অনুগ্রহের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করেনি।
“সুতরাং নিজের কাজ সম্পর্কে তোমার যুক্তি এটাই?”
“মোটামুটি এটাই,” রিও আলোর ভেতরে ফিরে এলো।
“ত্যারু ঠোঁট দিয়ে অস্পষ্ট বাঁশির শব্দ করল, এবং ডাক্তার তার দিকে তাকাল।
“হ্যা, তুমি হয়ত মনে করতে পারো যে, এই ধরনের ধারনা পোষণ করার জন্যে অহংকারী মনের অধিকারী হতে হয়। কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলছি যে, চলার জন্যে যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশী অহংকার আমার নেই। আমি এটাও জানি না, আমার জন্যে কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। অথবা প্লেগ শেষে আসলেই কী ঘটবে। আমি শুধু জানি, যে মানুষেরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদেরকে রোগমুক্ত করা দরকার। পরে আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করব। এখন দরকার শুধু তাদেরকে সুস্থ করে তোলা। আমি তাদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করছি, যতটা আমার পক্ষে সম্ভব।“
“তাহলে কার বিরুদ্ধে তোমার এই যুদ্ধ?”
রিও জানালার ভেতর দিয়ে বাইরে তাকাল। দিগন্তের উপরে একটা ছায়ার রেখা সাগরের উপস্থিতি জানাচ্ছে। নিজের ক্লান্তি ছাড়া আর কিছুই তার মনে হলো না। সে যুদ্ধ করছে একটা আকস্মিক অযৌক্তিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে। এবং ত্যারুকে কথাগুলো বলছে নিজেকে কিছুটা নির্ভার করার জন্যে।
“আমি কোনো খেয়ালী মানুষ নই, ত্যারু। আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি আমার মধ্যে কোনো খেয়ালী ভাব নেই। আমি যখন এই পেশায় প্রথম ঢুকি, তখন আমি আমার দায়িত্বগুলো অন্যমনস্কতার সাথে পালন করতাম। কারণ, কাজ করতে আমার ভালো লাগত না। ডাক্তারিকে আমার কাছে অন্য যেকোনো পেশার মতোই মনে হতো। একটি উঠতি বয়সের যুবকের কাছে যা মনে হতে পারে। সম্ভবত, একারণেও যে, আমার মতো একজন শ্রমজীবীর সন্তানের জন্যে কাজটি আসলেই কঠিন ছিল। কিন্তু তারপর আমি মানুষদেরকে মরতে দেখলাম। তুমি কি এটা জানো যে, অনেকেই আছে যারা মরতে চায় না? তুমি কি কখনও শুনেছ কোনো নারী তার শেষ নিঃশ্বাসের সময়ে বলছে, ‘কখনই না!’ ? আমি শুনেছি। নিজের সম্পর্কে আমার আরেকটি পর্যবেক্ষন হলো, আমি কখনই কঠিন মনের অধিকারী হতে পারি না। চাকুরির প্রথমদিকে আমার বয়স কম ছিল। সবকিছু দেখার পর আমি উত্তেজিত হয়ে পড়তাম। অথবা ভাবতাম যে, আমি উত্তেজিত হয়েছি। তবে সময়ের সাথে আমি অনেককিছুই মেনে নিতে শিখেছি। কিন্তু কখনই মানুষের মৃত্যু সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি। আমার সম্পর্কে এটাই সত্য, সবকিছুর পরে।”
রিও নীরব হয়ে বসল। সে তার মুখের ভেতরে শুষ্কভাব অনুভব করছিল।
“সবকিছুর পরে?" ত্যারু মৃদুভাবে তার কথার পুনরাবৃত্তি করল।
"সবকিছুর পরে,” ডাক্তার আবার বলল। তারপর একটু ইতস্তত করে ত্যারুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা এমনকিছু যা তোমার মতো মানুষ সম্ভবত বুঝতে পারবে। আমার ধারণা পৃথিবীর জীবনই যেহেতু মৃত্যু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সেহেতু সম্ভবত ঈশ্বর পছন্দ করেন না যে, আমরা তাকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করি এবং আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। তিনি চান আমরা স্বর্গের দিকে তাকিয়ে তার কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করি, যেখানে তিনি চুপ করে বসে আছেন।“
ত্যারু মাথা নাড়ল।
“হ্যা। তবে তোমার বিজয় কখনই চিরস্থায়ী হবে না। এটাই সত্য।”
রিও’র মুখ অন্ধকার হলো।
“হ্যা, আমি জানি। তবে সংগ্রাম ছেড়ে দেওয়ার জন্যে এটা কোনো কারণ হতে পারে না।”
“আমিও স্বীকার করছি যে, এটা কোনো কারণ হতে পারে না। তবে আমি এখন কল্পনা করতে পারছি যে, প্লেগ তোমার জন্যে কি অর্থ বহন করছে।”
“হ্যা। একটি অন্তহীন পরাজয়,” রিও বলল।
ত্যারু মুহূর্তের জন্যে ডাক্তারের দিকে তাকাল। তারপর ঘুরে গিয়ে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রিও তাকে অনুসরণ করল। প্রায় পাশাপাশি চলে আসার পর ত্যারু হঠাত প্রশ্ন করলঃ
“তোমাকে এগুলো কে শিখিয়েছে, ডাক্তার?”
“ভোগান্তি।”
রিও’র কাছ থেকে তাৎক্ষণিক উত্তর এলো।
রিও তার সার্জারি কক্ষের দরজা খুলল এবং ত্যারুকে জানাল যে, সেও বাইরে যাচ্ছে। উপশহরে তাকে একটা রোগী দেখতে যেতে হবে। ত্যারু বলল যে, সে তার সাথে যেতে চায়। রিও রাজী হলো। হলের ভেতরে ম্যাদাম রিও’র সাথে তাদের দেখা হলো। ডাক্তার ত্যারুকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।
“আমার এক বন্ধু,” সে বলল।
“খুব ভালো,” ম্যাডাম রিও বললেন, “তোমার সাথে পরিচিত হতে পেরে খুশি হলাম।”
তিনি চলে যাওয়ার পর ত্যারু উল্টো ফিরে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। নামার জায়গায় রিও একটা সুইচ চাপ দিয়ে সিঁড়ির বাতিগুলো জ্বালাল। কিন্তু তারপরেও সিঁড়িটা অন্ধকারেই রয়ে গেল। সম্ভবত আলো বাঁচানোর জন্যে নতুন কোনো নির্দেশ এসেছে। অবশ্য এটা বাস্তবে জানার কোনো উপায় ছিল না। কারণ, কিছুদিন যাবত রাস্তা বা প্রাইভেট বাড়ির সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এটাও হতে পারে যে, বাড়ির প্রহরীরাও অন্যদের মতো তাদের কর্তব্যকে পাত্তা দিচ্ছিল না। ডাক্তারের অবশ্য এসব বিষয়ে চিন্তা করার সময় ছিল না। এই সময়ে আবার ত্যারু’র কন্ঠস্বর শোনা গেল পেছন হতে। ‘আরেকটা কথা, ডাক্তার। যদিও কথাটি অপ্রয়োজনীয়, তবুও বলছি। তুমি সম্পূর্ণ ঠিক।”
ডাক্তার ছোট্টকরে মাথা নাড়াল। কিন্তু অন্ধকারের জন্যে তা দেখা গেল না।
“সত্য হলো, সবকিছুই আমার আয়ত্বের বাইরে। কিন্তু তুমি? তুমি এগুলো সম্পর্কে কী ভাবো?”
“আমার শেখার জন্যে খুব কমই অবশিষ্ট আছে,” ত্যারু শান্তভাবে উত্তর দিলো।
রিও ইতস্তত করছিল। পেছনেই ত্যারুর পা একটা সিঁড়ির উপরে পিছলে গেল। সে রিও’র কাঁধের উপরে হাত দিয়ে নিজেকে স্থির করল।
“তুমি কি মনে করো যে, তুমি জীবনের সবকিছুই জানো?”
অন্ধকারের ভেতর থেকে পূর্বের মতো ত্যারুর আত্নবিশ্বাসী উত্তর এলো।
“হ্যা।”
রাস্তার উপরে আসার পর তারা বুঝতে পারল যে, অনেক রাত হয়ে গেছে। সম্ভবত রাত এগারোটা। শহরের বুকে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে আছে। শুধু অস্পষ্ট কিছু উড়াউড়ির শব্দ ছাড়া। দূরে একটা এ্যাম্বুলেন্সের ঘন্টার শব্দ শোনা গেল। তারা গাড়িতে উঠে বসল। রিও গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো।
“কাল সকালে তুমি হাসপাতালে এসো,” সে বলল,”একটা ইনজেকশন দিতে হবে। তবে এই যুদ্ধে নামার আগে মনে রেখো যে, এখান থেকে জীবিত হিসেবে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রতি তিনজনে একজন।
“তোমার এই ধরণের অনুমানের ভিত্তি নেই, ডাক্তার। এটা তুমিও জানো, আমিও জানি। একশত বছর আগে প্লেগে পারস্যের পুরো জনপদকে বিরান করে দিয়েছিল। একজন মাত্র ছাড়া। সেই একমাত্র জীবিত ব্যক্তিটির কাজ ছিল প্লেগে মরে যাওয়া মৃতদেহগুলোকে ধুইয়ে পরিষ্কার করা। সেই মহামারীর পুরো সময় ধরেই সে কাজটি করেছিল।”
“সেও তিনজনে একজন এই সুযোগটি পেয়েছিল,” বলে রিও তার কন্ঠস্বরকে নিচু করল। “কিন্তু তুমি সঠিক যে, ভবিষ্যতে এবিষয়ে কী হবে তা আমরা জানি না।
তারা উপশহরে ঢুকল। গাড়ির হেডলাইট খালি রাস্তাটিকে আলোকিত করছিল। কারটি থামল। সেটার সামনে দাঁড়িয়ে রিও ত্যারুকে জিজ্ঞেস করল, সে তার সাথে ভেতরে যেতে চায় কিনা।
ত্যারু বললঃ “হ্যা।” এসময়ে আকাশ থেকে একটা আলোর ঝলকানি তাদের মুখকে আলোকিত করল।
সেই আলোতে হঠাত করে রিও হেসে উঠল। তার সেই হাসির ভেতরে বন্ধুতা ছিল।
“ত্যারু, পৃথিবীর কোন বিষয়টি তোমাকে এধরণের কাজে প্ররোচিত করেছে?”
“আমি জানি না। সম্ভবত আমার নৈতিকতার কোড।”
“কী সেটা?”
“উপলব্ধির ক্ষমতা।”
ত্যারু ঘরটির দিকে ফিরল। বৃদ্ধ এজমা রোগীর ঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বে রিও আর তার মুখটি দেখতে পেল না।
.png)