এই সময়ে শহরে প্রথবারের মতো ওয়াটারপ্রুফ পোশাক এলো। সবাই অবাক হলো রবারের তৈরি চকচকে পরিচ্ছদ দেখে। এর কারণ হলো, আমাদের খবরের কাগজগুলো আমাদেরকে জানাল যে, ২০০ বছর আগে দক্ষিণ ইউরোপে প্লেগের সময়ে ডাক্তাররা ইনফেকশনের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হিসেবে তৈলাক্ত পোশাক পরত। ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চল উঠে গেছে এমন ওয়াটারপ্রুফ পোশাক বিক্রি করতে শুরু করল। ক্রেতারাও ভাবল যে, এগুলো তাদেরকে জীবানুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেবে।
কিন্তু তারপরেও ‘সকল আত্মাদের দিন’ এর নতুন বিষয়গুলো আমাদের ভুলিয়ে দিতে পারল না যে, শহরের গোরস্থানগুলোতে কেউ পরিদর্শন করতে যাচ্ছে না। অথচ এই সময়ে আগের বছরগুলোতে রাস্তার গাড়িগুলো ক্রিসেনথিমামের গন্ধে ভরে থাকত এবং মহিলাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যেত তাদের পরিবারের সদস্যদের কবরগুলো পর্যন্ত। ফুল দেওয়ার জন্যে। সবাই গোরস্থানে হাজির হয়ে নিজেদের মৃত আত্মীয়দের ত্যাগ করে ভুলে থাকার জন্যে অনুতাপ করত।
.png)
কিন্তু প্লেগের বছরে মানুষেরা তাদের মৃত আত্মীয়দের কথা কেউ মনে করিয়ে দিক এটা চাইল না। বরং তাদের কাছে মনে হলো ইতিমধ্যেই তারা তাদের মৃত আত্মীয়দের নিয়ে যথেষ্টই চিন্তা করেছে। সুতরাং অনুতাপ ও ব্যাথা নিয়ে তাদেরকে আবার দেখতে যাবার প্রশ্ন তাদের মনে এলো না।
এমনকি তারা বছরের এই নির্দিষ্ট দিনেও তাদের কাছে গিয়ে নিজেদের অনুপস্থিতির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরারও কোনো প্রয়োজন বোধ করল না। বরং তাদেরকে আত্মার শান্তি বিনষ্টকারী মনে করে ভুলে যাওয়াই অধিকতর যৌক্তিক বলে মনে করল। মোটের ওপর তারা এ বছর মৃতদের দিনকে তারা ইচ্ছাকৃত ও নির্মোহভাবে অস্বীকার করল। যেমন কটার্ড শুষ্কভাবে বলল, এই বছরের প্রতিটা দিনই ছিল মৃতদের।
তবে এবছর আসলেই মহামারির চিতাগ্নি আরো বেশি আনন্দের সাথে শ্মশান বা কবরস্থানে জ্বলছিল, যদিও মৃতের সংখ্যা আর বাড়ছিল না। মনে হচ্ছিল যে, প্লেগ চিরস্থায়ীভাবে এই শহরে বসতি স্থাপন করেছে, তার সমস্ত উগ্রতা নিয়ে। এবং প্রতিদিনই একজন ভালো সিভিল সার্ভেন্টের উৎসাহ ও সময়নিষ্ঠা নিয়ে সে মানুষ হত্যা করছে।
তাত্বিকভাবে ও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে, এটা হলো একটা আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি। অনেকের কাছেই মনে হলো যে, মৃত্যুর গ্রাফ দীর্ঘসময় ওপরে উঠার পর এখন চেপ্টা ( flattened) রূপ ধারণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে এ বিষয়ে ডাক্তার রিচার্ডের মন্তব্য ছিল খুবই ভরসাজনক। তিনি হাত মুছতে মুছতে বললেন, “আজকের গ্রাফটা ভালো।”
তার ধারনামতে রোগ এখন জোয়ার-রেখায় অবস্থান করছে। এরপর ভাটার টানে নীচে নেমে যাবে। এর পুরো কৃতিত্বই তিনি দিলেন ডাক্তার ক্যাসেলের আবিষ্কার করা নতুন সিরামকে। অবশ্য ডাক্তার ক্যাসেল নতুন সিরামের কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত নন। তর্কে না গিয়ে এই বৃদ্ধ ডাক্তার রিচার্ডকে বললেন যে, ভবিষ্যত এখনো পুরোপুরিভাবে অনিশ্চিতই রয়ে গেছে, কারণ ইতিহাস থেকে এটা প্রমাণিত যে, মহামারির পুনঃপ্রকোপ তখনই দেখা গিয়েছে, যখন সবাই সেটিকে সবচেয়ে কম আশা করেছে।
নগর কর্তৃপক্ষও অনেকদিন থেকে জনগণের মনোবলে প্রেরণা জাগানোর ইচ্ছা পোষণ করছিল। কিন্তু প্লেগের আতিশয্যের কারণে পেরে উঠছিল না। তারা এবার ডাক্তারদের একটি সভা ডেকে এবিষয়ে একটি ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সভা অনুষ্ঠিত হবার অব্যবহিত আগে ডাক্তার রিচার্ড নিজেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে গেলেন।
এই দুঃখজনক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কর্তৃপক্ষ আবার তাদের পূর্বের হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ফিরে গেল। ডাক্তার ক্যাসেল নিজেকে আবার বন্দি করলেন সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে সিরাম তৈরি করার কাজে। ইতিমধ্যেই নগর প্রধানের অফিসগুলো ছাড়া বাকী সকল অফিসই হাসপাতাল অথবা কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এগুলোকে বাদ রাখা হয়েছিল প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে এবং কমিটির সভা পরিচালনার জন্যে।
সাধারণভাবে অবশ্য এই সময়ে মহামারি পরিস্থিতি আপাতভাবে স্থির থাকার কারণে ডাক্তার রিও’র সংগঠন মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারল আগের মতোই। উচ্চ কাজের চাপের মধ্যেও ডাক্তার ও তাদের সহযোগীদের আরো প্রচেষ্টা নিতে হলো না। তাদের যা করতে হলো তা হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের আগের অতিমানবিক কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া।
নিউমোনিক ইনফেকশন, যা সম্প্রতি শনাক্ত করা হয়েছিল, তা এখন পুরো শহরে ছড়িয়ে যেতে লাগল। সবাই বিশ্বাস করতে লাগল যে, প্রবল বায়ুপ্রবাহ প্লেগের শিখাকে মানুষের বুকে প্রজ্জ্বলিত করে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিউমোনিক প্লেগের রোগীরা আগের রোগীদের চেয়ে আরো তাড়াতাড়ি মরে যেতে লাগল। কাশি ও রক্তবমির পর। এই নতুন ধরণের মহামারিকে আরো বেশি সংক্রামক এবং মারাত্নক বলে মনে হলো। তবে বিশেষজ্ঞদের মতামত এ বিষয়ে বরাবরই বিভক্ত রয়ে গেল। আরো বেশি নিরাপত্তার জন্যে স্যানিটারি ওয়ার্কাররা মসলিনের তৈরি জীবানুমুক্ত মাস্ক পরল।
সার্বিকভাবে এই পরিস্থিতিতে প্লেগের ধ্বংসযজ্ঞ বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিউবোনিক প্লেগের প্রকোপ কমে যাওয়ার কারণে মৃত্যুর হার বাড়ল না। আগের মতোই স্থির রয়ে গেল।