ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ক্যাম্পাস ]

স্বাস্থ্যবীমার আওতায় শিক্ষক-কর্মচারী, অরক্ষিত শিক্ষার্থীরা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:৪৩, ৩ অক্টোবর ২০২৬
স্বাস্থ্যবীমার আওতায় শিক্ষক-কর্মচারী, অরক্ষিত শিক্ষার্থীরা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত মো. ইয়াসিন উল্লাহ। দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন হাতে টিউমারজনিত সমস্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। চিকিৎসা বাবদ তিনি প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। স্বাস্থ্যবীমার আওতায় থাকায় তিনি একটা আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। ফলে তার অর্থনৈতিক ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হয়েছে বলে জানান।

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবীমার বিষয়টি আমি জানতাম। ফলে নির্বিঘ্নে চিকিৎসা করেছি। এরপর খরচাপাতির সমস্ত কাগজপত্র দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে আমাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়।’

ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি)। 'লিউকেমিয়া', এক ধরনের রক্তনালীর ক্যানসার সমস্যায় ভুগছেন কুবির সাজ্জাদ হোসাইন শরিফ। তিনি গত এক বছর ধরে এ সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে জায়গাজমি বিক্রি করেছেন। দুই মাস আগে 'বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট' করেছেন। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভাগ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় এখনও কেমোথেরাপি ও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা। চিকিৎসার বিষয়ে এখন তাকে ভাবতে হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের থেকে ধারদেনা করে তার বাবা কোনোভাবে চিকিৎসা করাচ্ছেন।

শুধু সাজ্জাদ নন, এরকম আরও অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে টাকা তুলে চিকিৎসার ব্যয় বহন করছেন। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে জায়গাজমি বিক্রি করছেন। আত্মীয়স্বজনের কাছে দারস্থ হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা থাকলে আরও উন্নত মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যেত।

সাজ্জাদ বলেন, ‘কিছু জায়গাজমি বেচে এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে দশ মাস চিকিৎসা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাদের উদ্যোগে কিছু টাকা ম্যানেজ করে দিয়েছে। বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্টের পর ভেবেছিলাম ভালো হয়ে যাব। প্রতি মাসে এখনও লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এই রোগ যাদের হয় তাদের অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা থাকলে কিছুটা চাপ কম হতো।’

আরেক শিক্ষার্থী তাসনিম হক অনন্যা। তিনি সম্প্রতি ক্যানসারজনিত সমস্যা থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন। এখনো প্রতি মাসে ওষুধ বাবদ তিনি ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করছেন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে তার বাবা নতুন বাড়ি তৈরির জায়গা বিক্রি করেছেন। তার সহপাঠীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে ঘুরে চাঁদা তুলে চিকিৎসার ব্যয়ভার নির্বাহ করেছেন।

তিনি জানান, 'আমার ক্যানসারের ধরন অনেক এগ্রেসিভ ছিল। দ্রুত সময়ের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছিল। প্রথম দিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা প্রয়োজন ছিল। একসময়ে টাকা এত বেশি লাগছিল যে বাবা বাড়ি তৈরির জায়গা বিক্রি করেছেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গিয়ে টাকা ম্যানেজ করেছে।'

তিনি আরও জানান, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবীমা থাকলে আমাকে এত অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হতো না। আমাদের যেসব বন্ধুবান্ধব বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলেছে, তাদের ক্লাস-পরীক্ষাও মিস হতো না। আমি চাই স্বাস্থ্যবীমার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগ গ্রহণ করুক।'

দুই যুগ পেরিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ ২০ বছরে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও তেমন পাওয়া যায় না।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড সাময়িক জীবন বীমার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

এ ছাড়া গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীর উপস্থিতিতে উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড জীবন ও স্বাস্থ্যবীমার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সেমিস্টারপ্রতি ১০০ টাকা বিনিময়ে স্বাস্থ্যবীমা চালুর আশ্বাস দেয় প্রশাসন।

তবে আশ্বাসের নয় মাস অতিবাহিত হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি।

লোকপ্রশাসন বিভাগের মানসুরা আফরিন বলেন, 'শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা থাকা এখন সময়ের দাবি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। হঠাৎ বড় ধরনের চিকিৎসার খরচ তাদের পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা আর্থিক ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।'

নিজের অসুবিধার কথা উল্লেখ করে মানসুরা বলেন, 'এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আমার ডান হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতঃপর অপারেশন, সার্জারি ও যাবতীয় চিকিৎসার খরচসহ বিপুল পরিমাণের আর্থিক সহায়তা আমার পরিবারকে করতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমি চিকিৎসাধীন। হঠাৎ করে এমন খরচ পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর ভর্তির সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন হাসপাতালে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বীমা সুবিধা পান শিক্ষার্থীরা। তবে কোনো শিক্ষার্থী চিকিৎসাধীন মারা গেলে এককালীন এক লাখ টাকা পাবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ বিভাগে ভর্তিকালীন সময়ে বাৎসরিক ২৫০ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে এই বীমার অন্তর্ভুক্ত হতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য এ বীমা বাধ্যতামূলক। অধ্যয়নরত অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে অথবা ছাত্রত্ব শেষ হলে এ বীমা শেষ হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমায় অন্তর্ভুক্ত হতে হলে প্রতি বছর প্রিমিয়াম হিসেবে ৩৯০ টাকা জমা দিতে হয়। বীমার আওতায় কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে এককালীন ২ লাখ টাকা পাবে। জীবিত অবস্থায় তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাবে এবং হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নিলে বছরে ১০ হাজার টাকা পাবে।

ঢাবি, রাবি ও জাবির পর চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়—এই দাবি শিক্ষার্থীদের।

মন্দিরা দাস বলেন, 'ঢাবি, রাবি ও জাবির মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাস্থ্যবীমা থাকা দরকার। বিশেষ করে শিক্ষকদের এই ক্ষেত্রে ভাবা উচিত যে—তাদের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে, শহরে এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ চালায়। এই ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং প্রশাসনের আরও আন্তরিক হয়ে চিন্তা করা উচিত।'

ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন বলেন, 'আমরা এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে নিব।'

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, 'শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমার ব্যাপারে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কিছু জটিলতা দেখিয়েছে। আমরা আবার কথা বলব। কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখালে আমরা তাদের সাথে কাজ করব।'

ডেইলি-বাংলাদেশ/কুবি/জেডআই
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!