ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

পর্যটকে মুখর মহাস্থানগড়

মাসুম হোসেন, বগুড়া
প্রকাশিত: ১২:১৫, ১৪ জুলাই ২০২২
পর্যটকে মুখর মহাস্থানগড়
বগুড়ার মহাস্থানগড়। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঈদের ছুটি শেষ হলেও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় কমেনি দর্শনার্থীদের। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র বগুড়ার মহাস্থানগড় এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। ঈদের চতুর্থ দিন বুধবারও দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে। ঐতিহাসিক এ মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, পশুরামের রাজপ্রাসাদ, জাহাজ ঘাটা, গোবিন্দ ভিটা, হযরত শাহ সুলতান বলখী (র.) এর মাজার শরীফ, মহাস্থানগড়ের বৈরাগি ভিটার বিপরীত দিকের শীলাদেবীর ঘাটসহ শিবগঞ্জের ভাসুবিহারের প্রত্নতত্ত্ব এলাকায় ঘুরে বেড়ান দর্শনার্থীরা। 

ইতিহাস কথা বলে, ইতিহাস অনুপ্রেরণা যোগায়। ইতিহাসের কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখতে কার না ভালোলাগে। মন, প্রাণ ভরে যায়। চোখ জুড়ায়। ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বগুড়া একটি লোভনীয় জেলা। কাছ থেকে হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আছে এই জেলায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণকারীদের পাশাপাশি দেশের বাইরের পর্যটকদের দর্শনীয়স্থানের তালিকায় বগুড়া থাকেই। মহাস্থানগড়ের ইতিহাসের চেতনা বগুড়াকে দেশে খ্যাতির শীর্ষে তুলেছে। 

বুধবার দুপুরে কথা হয় প্রবাসী আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে সপরিবারে মহাস্থানগড়ে ঘুরতে এসেছেন। সুযোগ পেলেই তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহাস্থানগড়ে আসেন। 

Advertisement

সারিয়াকান্দি উপজেলার মূলবাড়ি চড়ের বাসিন্দা সোনাহার ইসলামও পরিবার নিয়ে মহাস্থানগড়ে ঘুরতে এসেছেন। তিনি জানান, ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহাস্থানগড়ে ঘুরতে এসেছেন। ভালো সময় কাটছে তাদের। পরিবারের সবাই অনেক খুশি।

জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরদিন থেকে দর্শনার্থীরা মহাস্থানগড়ে আসা শুরু করেন। ঈদের দুইদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন। তবে বুধবার তুলনামুলক পর্যটকদের সংখ্যা কমে গেছে। গত ১১ জুলাই দর্শনার্থী ছিলেন ৫ হাজার ৫৪৯ জন। পরদিন ১২ জুলাই দর্শনার্থী কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪৮৪ জনে।

প্রত্মতত্ত্ব অধিদফতরের মহাস্থান কার্যালয়ের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা একটু কম। তবে সারা বছরের তুলনায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার অনেক বেশি মানুষ মহাস্থানগড় ঘুরতে এসেছেন। তাদের নিরাপত্তায় সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

জানা যায়, কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত এবং পাল শাসকদের প্রাদেশিক রাজধানী রাজধানী ছিল। দুর্গের বাহিরে উত্তর পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ৭-৮ কিলোমিটারের মধ্যে এখনো বিভিন্ন ধরণের বহু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। যা উপ-শহরের স্বাক্ষ্য বহন করে।

জানা গেছে, মহাস্থানগড়ের বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ পুণ্ড্রবর্ধণভূক্তির রাজধানী পুণ্ড্রনগরের সুদীর্ঘ প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী। এ ধ্বংসাবশেষ বগুড়া শহরের ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিত তীরে অবস্থিত। সমগ্র বাংলার সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রাচীন এ দুর্গনগরী পর্যায়ক্রমে মাটি ও ইটের বেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত। যা উত্তর-দক্ষিণে ১ হাজার ৫২৫ মিটার দীর্ঘ এবং পূর্ব পশ্চিমে ১ হাজার ৩৭০ মিটার প্রশস্ত ও সমতল ভূমি থেকে ৫ মিটার উঁচু। বেষ্টনী প্রাচীর ছাড়াও পূর্ব দিকে নদী ও অপর তিনদিকে গভীর পরিখা নগরীর অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হুয়েন সাঙ ভারতবর্ষ ভ্রমনকালে (৬৩৯-৬৪৫) পুণ্ড্রনগর পরিদর্শন করেন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষকে হুয়েন সাঙ বর্ণিত পুণ্ড্রনগর হিসেবে শনাক্ত করেন।

১৯২৮-২৯ সালে মহাস্থানগড়ে সর্বপ্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন কার্য শুরু হয়। এ সময় নগরীর মধ্যে বৈরাগীর ভিটা, মুনীর ঘোন ও বাইরে গোবিন্দ ভিটা নামক তিনটি স্থানে খনন করা হয়। এর দীর্ঘদিন পর ১৯৬০-৬১ সালে এবং পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে থেকে শুরু করে নিয়মিতভাবে দুর্গের বিভিন্ন অংশ উৎখনন করা হয়। তবে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব দুর্গ প্রাচীরের মধ্যবর্তী এলাকায় খনন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০০০ সাল থেকে মাজারের পাশে খনন কাজ শুরু করা হয়।

দীর্ঘ সময়ব্যাপী ব্যাপক অনুসন্ধান ও খননের ফলে দুর্গ নগরীরর ভিতরে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে শুরু করে মুসলিম যুগ পর্যন্ত প্রায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে বসতি নিদর্শন উম্মোচিত হয়েছে। ১৮ টি স্তরে প্রাক মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও মুসলিম যুগের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি রাস্তা, নর্দমা নালা, কূপ, মসজিদ, মন্দির, তোরণ, বুরুজ, ইত্যাদি উম্মোচিত হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: বগুড়া
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!