সেন্টমার্টিনে বাজার করতে লাগেনা টাকা
সেন্টমার্টিনে বাজার সাদাই করতে টাকা লাগছে না। পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী জমা দিলে মিলছে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য।
পরিত্যক্ত প্লাস্টিককে সবাই অবমূল্যায়ন করলেও এবার সেই প্লাস্টিকই হয়ে উঠেছে মূল্যবান। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জমা দিয়েই ব্যাগভর্তি বাজার করতে পারছেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারা। এক থেকে পাঁচ কেজি প্লাস্টিক জমা দিয়ে চাল, ডাল, তেল, মুরগি, ডিম, আটা, সুজি, কম্বল, শীতের কাপড় ও লুঙ্গি নিচ্ছেন দ্বীপবাসী। তাদের দাবি, প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কারের পাশাপাশি উপকৃত হচ্ছেন তারা। আর সৈকতকে দূষণমুক্ত রাখতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার সকালে দ্বীপে দেখা যায়, সবার হাতে বস্তা। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী-শিশু সবাই ছুটছেন এই বস্তা নিয়ে। তবে বস্তার ভেতরে রয়েছে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, চিপস ও জুসের প্যাকেট। বেড়াতে এসে সৈকতে বালিয়াড়িতে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেছেন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা, যা জমা দিয়ে বাজার করবেন তারা। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে সেখানে আর টাকার প্রয়োজন হবে না। পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জমা দিয়েই সেন্টমার্টিনের অধিবাসীরা ব্যাগভর্তি বাজার বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।
দ্বীপের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, পর্যটকরা দ্বীপে আসলেই অনেকেই প্লাস্টিকের বোতল, চিপস ও জুসের প্যাকেট সৈকতের বালিয়াড়িতে ফেলে দেন। আর আমরা এসব পরিত্যক্ত প্লাস্টিকগুলো সংগ্রহ করে রাখি। এরই মধ্যে এক সপ্তাহে পাঁচ বস্তা প্লাস্টিক সংগ্রহ করেছি। এখন এসব প্লাস্টিক জমা দিয়ে ব্যাগ ভর্তি বাজার করে ঘরে নিয়ে যাব। বেলা ১২টা না বাজতে দ্বীপের মেরিন পার্ক এলাকা মানুষে ভরে যায়। বস্তাভর্তি প্লাস্টিক নিয়ে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকেন নারী-পুরুষ ও শিশুরা। এরপর প্লাস্টিক জমা দিলেই মিলছে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। অবিশ্বাস্য হলেও পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জমা দিয়েই বিনামূল্যে সেন্টমার্টিনের অধিবাসীরা ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে বাসায় যাচ্ছেন। প্লাস্টিকের বিনিময়ে নিত্যপণ্য পাওয়ায় খুশি দ্বীপের মানুষ।
দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা আয়েশা খাতুন বলেন, ১০ কেজি প্লাস্টিক জমা দিয়ে একটি মুরগি, চাল, তেল ও ডিম নিয়েছি। অনেক খুশি আমরা। একদিকে দ্বীপের প্লাস্টিক পরিষ্কার হচ্ছে অন্যদিকে আমরা প্রায় বিনামূল্যে ব্যাগভর্তি বাজার পাচ্ছি।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সংগৃহীত প্লাস্টিক দ্বীপ থেকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে রিসাইকেল করা হয়। সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ দিয়ে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাসেবীরা কক্সবাজারে তৈরি করেছেন বিশাল আকৃতির একটি ‘প্লাস্টিক দানব’। ধারণা করা হচ্ছে এই দানব এশিয়ার সমুদ্র সৈকতের সবচেয়ে বড় স্ট্যাচু। এই দানব তৈরির মাধ্যমেই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন মানব সমাজকে একটি বার্তা দিতে চায় যে, প্লাস্টিকের ফলে পরিবেশ যেই হারে দূষিত হচ্ছে তা ধীরে ধীরে দানবে রূপ নিচ্ছে। আর এই দানবই পরবর্তীতে মানবসমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু সুফিয়ান বলেন, সেন্টমার্টিনসহ অন্যান্য দ্বীপ ও সমুদ্রসৈকতকে দূষণমুক্ত রাখতে জেলা প্রশাসন নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও মানুষের অসচেতনতা ও অবহেলার কারণে সেটি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করে ও তাদের সম্পৃক্ত করে যে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে তাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে জেলা প্রশাসন। আশা করছি এই উদ্যোগের মাধ্যমে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা হবে।
প্রতি ১৫ দিন পরপর প্লাস্টিকের বিনিময়ে এসব পণ্য সরবরাহ করে বিদ্যানন্দ, যা শুরু হয় গত মাসে। এতে প্রতিবার ৮ থেকে ১০ টন প্লাস্টিক জমা দেন দ্বীপের মানুষ। এগুলো ঢাকায় নিয়ে রিসাইক্লিং করে ব্যবহার উপযোগী করা হয়।