শীতে কাবু লক্ষ্মীপুর, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা
লক্ষ্মীপুরে শৈত্য প্রবাহে জেলার আনাচে কানাচে হাড় কাঁপানো শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত চারদিন থেকে প্রায় সূর্যের দেখা মেলেনি। ফলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় নাকাল হয়ে পড়েছে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। সন্ধ্যা নামলে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেনা কেউ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ।
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি জবুথবু হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চল এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীরা। শিশু, বয়ষ্ক ও এজমা রুগীরা পড়েছেন দুর্ভোগে। পাশাপাশি গবাদী পশুও শীতে কষ্ট পাচ্ছে। দিনের বেলায় দুপুর ১২ টা পর্যন্ত সড়কে গাড়িগুলো হেডলাইট চালিয়ে চলাচল করতে হয়। আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করছেন অনেকে।
সকাল থেকে গরম কাপড় গায়ে দিয়ে, কানটুপি ও গলায় মাফলার পেঁচিয়ে শহরের মানুষ ঘর থেকে বের হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বের হতে পারছেনা। এমন শীত থেকে রেহাই পেতে আগুনের উত্তাপ চায় অনেকেই। খড়কুটা ও লাকড়ির আগুনে শীতের কাঁপনি রোধে চেষ্টা উপকূলের বাসিন্দারা। এরই মধ্যে মাঝে মাঝে হিমেল বাতাস। বয়ে যাওয়ায় বাড়ছে ঠান্ডা। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতাও বাড়ছে বেশি। শীত বাড়তে থাকায় রাত না হতেই ঘরে ফিরে বেশির ভাগ মানুষ। হাট-বাজারে উপস্থিতি কমে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও কমতে থাকে। অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়ে। বাজারের ব্যবসায়ীরা সকালে দোকান-পাট খোলেন কুয়াশা কেটে গেলে।
.png)

জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলায় গত চার দিন ১৫ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল ঠান্ডার তাপমাত্রা। ফলে শিশু-বৃদ্ধরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। দিনভর ঘরের মধ্যে গায়ে কাঁথা-কম্বল জড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। খড়কুটো জালিয়ে উষ্ণতা নিচ্ছেন অনেকেই। গত দুই দিন সবচেয়ে বেশি তীব্র শীত অনুভূত হয়। শীতের কারণে মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বের হয়নি। যারা বের হয়েছেন তারাও যথেষ্ট শীত নিরাময় কাপড় পরে বেরিয়েছেন।
এদিকে উপকূলীয় এলাকা সদরের চররমনী মোহন মজুচৌধুরী হাট, রামগতি ও কমলনগেরর মেঘনার পাড়ের মানুষ জবুথবু অবস্থায় আছে। শীতের তীব্রতার কারণে সব ধরণের কাজ থেকে বিরত উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা। নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে ফিরে আসেন খালি হাতে। প্রচন্ড ঠান্ডায় মাছ শিকার করতে কষ্ট হয় তাদের।
মেঘনা নদী ভাঙা অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলোর পর্যাপ্ত গরম কাপড় না থাকায় তারা দুর্ভোগে রয়েছে। শীতে সেখানকার নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জনের ওপর প্রভাব পড়েছে। মেঘনা উপকূলীয় এলাকার মানুষ রাতের বেলায় খড়কুটা ও কাগজে আগুন দিয়ে অনকেই শীত থেকে কিছুটা রেহাই পেতে চেষ্টা করছে। এছাড়া মজুচৌধুরী হাট এলাকায় ছিন্নমূল মানুষরা খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।
লক্ষ্মীপুর শহরে রিকশা-ভ্যান চালকরা একটু পর পর হোটেল কিংবা চায়ের দোকানে চুলার কাছে গিয়ে হাত শেকে নিচ্ছেন।
অটোরিকশা চালক অব্দুল্যাহ হাড়কাঁপা কণ্ঠে বলেন, শীতের কারণে ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারেন না। তাছাড়া আগের মতো যাত্রী পাওয়া যায় না। শীতের ভয়ে গাড়িতে যাত্রী উঠতে চায়না। এতে করে তাদের আয় কমে গেছে। পরিবারের খরচ মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তার।
এদিকে শীতের গরম কাপড়ে বিক্রিতে ব্যস্ত শহরের বিভিন্ন ফুটপাতের দোকানগুলোতে। পুরাতন ও গার্মেন্টসের গরম কাপড়ে কিনতে ভিড় জমায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ। যার যার পছন্দের গরম কাপড় কিনে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। তবে নিম্নআয়ের মানুষ ফুটপাতে দোকান থেকে শীত নিবারণের জন্য সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার কিনছেন।
এছাড়া অনেকেই পুরাতন শীতের কাপড় সংগ্রহ করে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শহরের হতদরিদ্ররা নানাভাবে সহায়তা পেলেও, গ্রামের মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্টে দিন যাপন করছে।
শহরের দক্ষিণ তেমুহনী, উত্তর তেমুহনী, ঝুমুর চত্তর, চকবাজার, বাজারের বড় পুলের উপর, তমিজ মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি ফুটপাতে দেখা যায় এসব গরম কাপড় বিক্রি করছে। তাছাড়াও বাজারের বিভিন্ন বিপণী বিতানগুলোতে শীতের কাড়পের বেচাকেনা বেশ ভালো হচ্ছে। অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় ৭০ ভাগ বেচাকেনা হচ্ছে শীতের গরম কাপড়।
ঘনকুয়াশার কারণে লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরী হাট ঘাট দিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধ থাকে ফেরি চলাচল। ফলে সময় মতো নদী পারাপার হতে পারেন চট্রগ্রাম সিলেট কিংবা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সাধারণ মানুষ। অনেক সময় নিদিষ্ট সময়ে ফেরি ছাড়তে পারেনা।
এছাড়া তীব্র শীতের কারণে ক্ষতি হচ্ছে ফসলি জমির। নষ্ট হচ্ছে ধানের বীজতলা। রায়পুর, রামগতি ও কমলনগরের এলাকা গুলোতে হলুদ বর্ণ হয়ে গেছে ধানের বীজতলা। তাই স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন কৃষকদের।
তারা বলছেন, শীতের তীব্রতায় ধানের বীজতলায় ৩-৫ সেমি পানি ধরে রাখতে হবে। স্বচ্ছ পলিথিনের একটু উঁচু ছাউনি দিয়ে দিনের বেলা বীজতলা ঢেকে রাখতে হবে। প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৭০-৮০ গ্রাম থিউভিট/রনভিট/হেবিট যে কোন একটি ভালভাবে মিশিয়ে ৪-৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করতে। সকালে পাতার ওপর জমিয়ে থাকা শিশির রশি টেনে ঝরিয়ে দিতে হবে। পাতা হলুদ হলে প্রতি শতাশং ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম জিপসাম উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে ছাই ছিটানো যেতে পারে বলেও মনে করেন স্ব স্ব উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
শীত নিবারণে হতদরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষদের পাশে সর্বদা রয়েছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ।