তেল-মবিল ছাড়াই রাস্তায় চলছে মাইক্রোবাস
তার নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। নিজের একান্ত প্রচেষ্টায় কাঠের মাইক্রোবাস তৈরি করার পর কোনো ধরনের তেল-মবিল ছাড়াই রাস্তায় চালিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। দেখে বোঝার উপায় নেই যে, সেটি কাঠের তৈরি।
অদম্য পরিশ্রমী এই ব্যক্তিটি হলেন, নওগাঁর মান্দা উপজেলার দেলুয়াবাড়ি বাজারের অদূরে দেলুয়াবাড়ি সরদাপাড়া গ্রামের আব্দুল করিম মন্ডলের ছেলে সামছুদ্দিন মন্ডল ওরফে সামু মিস্ত্রি (৫২)।
৩ বোন ৩ ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবার বড়। বাবার তেমন একটা জায়গা জমি নেই। বাড়ি ভিটায় তার একমাত্র সম্বল। বর্তমানে তার ২ মেয়ে এবং ১ ছেলে রয়েছে। মেয়েদেকে বিয়ে দিয়েছেন। আর এক ছেলে রাজশাহী সরকারি পলিটেকনিক থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করার পরেও কোনো কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সামু মিস্ত্রি জানান, তার বাবার সংসারে অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে তিনি তেমন একটা লেখাপাড়ার সুযোগ পাননি। মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। তারপর আর কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তিনি কখনোই সময় অপচয় করতেন না। বিয়ের আগ থেকেই তিনি বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজ করতেন। একবার কোনো বিষয় তার মাথায় ঢুকলে তিনি ওই বিষয় নিয়েই চর্চা করে থাকেন।
তার কথা যে, অন্যরা পারলে আমি কেনো পারবো না? জীবন-জীবিকার তাগিতে ১৯৯৫ সাল থেকে অদ্যবধি তিনি টিনের ছাউনি মিস্ত্রী হিসেবে কাজ করে আসছেন। পেশাগত কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে তিনি বিভিন্ন রকমের সৃষ্টিশীল কাজ করে থাকেন। বিয়ের আগে তিনি একবার বাঁশের সাইকেল এবং বিয়ের পর তার ছেলে ছোট অবস্থায় একটি কাঠের ভ্যান বানিয়েছিলেন। এরপর একটি কাঠের মোটরসাইকেল তৈরি করেন। তালা-চাবি ও একটি খড় কাটা মেশিন এবং ডিজিটাল প্রজেক্টর তৈর করেন।
এর কিছুদিনপর ছেলের মোবাইল এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে ইউটিউবে ভিডিও দেখে কাঠ ও টিন দিয়ে একটি হেলিকপ্টার বানানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা আর সফল হয়নি। তবুও তিনি কখনো মনোবল হারাননি। প্রতিনিয়ত তার নিত্য নতুন চিন্তা-চেতনাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে ৬ মাসের প্রচেষ্টায় একটি কাঠের মাইক্রোবাস তৈরি করতে সক্ষম হন। এতে বিভিন্ন সামগ্রী (মোটর, শ্যাপ, চার্জার ব্যাটার, কন্ট্রোল বক্স, চাকা, স্টিয়ারিং এবং নতুন-পুরাতনসহ অন্যান্য উপকরণ) কিনতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
কাঠ দিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিতে এসব সামগ্রী ও যানবাহন তৈরি করে সমগ্র নেট দুনিয়ায় হইচই ফেলে দিয়েছেন তিনি। কাঠের মাইক্রোবাস তৈরি করে এখন ভাইরাল ম্যান বলে পরিচিত তিনি। প্রতিদিন সকাল-বিকেল দেলুয়াবাড়ি বাজার (নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়ক সংলগ্ন বিলপাকুড়িয়া শহিদবাজার রোডের মোড়) থেকে প্রায় হাফ কিলোমিটার দূরে তার গ্রামের বাড়িতে কাঠের তৈরি মাইক্রোবাস দেখতে ছুটে আসেন এলাকার কৌতূহলী মানুষ।
কুসুম্বা ইউপি চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে লোকমুখে শুনছি যে, দেলুয়াবাড়ির সামছুদ্দিন মন্ডল ওরফে সামু মিস্ত্রির কাঠের তৈরি মাইক্রোবাসটি সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও যে মানুষ অনেক কিছু করতে পারে সামছুদ্দিন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাকে যদি সরকারিভাবে সহযোগিতা করা যায় তবে তিনি দেশের জন্য অনেক বড় কিছু করতে পারবেন।