ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

হাটে বরই বিক্রি করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল দুর্জয়

রিফাত আল মাহামুদ, বাগেরহাট
প্রকাশিত: ১৭:৫২, ১০ আগস্ট ২০২৬
হাটে বরই বিক্রি করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল দুর্জয়
দুর্জয় ঘরামি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

অভাবের সংসারে কৃষক বাবার সীমিত আয়ে পরিবারের খরচ চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার দুর্জয় ঘরামি। ছোট শিশুদের পড়িয়ে টিউশনি করার পাশাপাশি হাটে বরই বিক্রি করে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে সে।

দুর্জয় ঘরামি কচুয়া উপজেলার মালিপাটন গ্রামের কৃষক রাজীব ঘরামির ছেলে। সে শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট দেখে বেড়ে ওঠা দুর্জয় বুঝেছিল, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। তাই অভাবকে বাধা না বানিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করে উপার্জন।

এলাকার ছোট শিশুদের পড়িয়ে টিউশনি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বই-খাতা ও পড়াশোনার প্রয়োজনীয় খরচ চালিয়েছে দুর্জয়। পাশাপাশি বিভিন্ন হাটে বরই বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করেছে। নিজের পড়াশোনা ও টিউশনি দুই দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি হাটে বরই বিক্রির কাজও করেছে সে।

Advertisement

অভাবের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার আগেও তাকে হিসাব করতে হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে নিজের অনেক চাহিদাও ত্যাগ করতে হয়েছে। তবে কোনো প্রতিকূলতাই তার পড়াশোনার আগ্রহ ও স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছে সে।

অবশেষে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মিলেছে সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি। জিপিএ-৫ অর্জন করে দুর্জয় শুধু পরিবারকেই গর্বিত করেনি, এলাকার মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক।

দুর্জয় ঘরামি বলেন, ‘আমার পরিবারের এমন সামর্থ্য নেই যে তারা আমার পড়াশোনার সব খরচ বহন করবে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকেই কাজ করে নিজের খরচ জোগাড় করতে হয়েছে। টিউশনি করেছি, আবার হাটে বরই বিক্রি করেও পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। তবে কখনো হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, যত কষ্টই হোক পড়াশোনা করে ভালো কিছু করতে হবে। ভবিষ্যতে আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। সরকার বা সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতা করলে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।’

দুর্জয়ের বাবা-মা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ছেলের পড়াশোনার সব খরচ আমরা দিতে পারিনি। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাড় করতে সে টিউশনি করেছে, হাটে বরই বিক্রি করেছে। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে আজ সে ভালো ফল করেছে। ছেলের এই সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। তার কষ্ট সার্থক হয়েছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

দুর্জয়ের এক প্রতিবেশী বলেন, ছোটবেলা থেকেই দুর্জয় পরিশ্রমী ও মেধাবী। পরিবারের আর্থিক সংকট থাকলেও সে কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। নিজের খরচ জোগাতে টিউশনি করার পাশাপাশি হাটে বরই বিক্রি করেছে। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে তার এই সাফল্যে এলাকাবাসী গর্বিত। তার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পরিমল কুমার মণ্ডল বলেন, ‘দুর্জয় খুবই পরিশ্রমী ও মেধাবী ছাত্র। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী ছিল। নিজের চেষ্টায় সে এগিয়ে গেছে। আমার ছাত্র এমন ভালো ফল করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে।’

দুর্জয়ের পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আর্থিক সংকট যেন তার উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে দুর্জয় আরও এগিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: বাগেরহাট
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!