তাদের দাবি, মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করে এত দ্রুত চার হত্যার রহস্য উদঘাটনের পুলিশের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর জিলা স্কুলের সামনে প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ অবরোধের কারণে নগরীর প্রধান সড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
.png)
নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এর আগে শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই মহল্লার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, জিজ্ঞাসাবাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বলেছেন, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি সেখানে গেলে তাকে প্রথমে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তবে পুলিশের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রশ্ন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে কীভাবে এত বড় হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটনের দাবি করা হচ্ছে? হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি তাদের।
জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও রংপুর জেলা দলের সাবেক খেলোয়াড় পুলক বলেন, হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুই ব্যক্তিকে জড়িত দেখিয়ে পুলিশের দেওয়া বক্তব্যে তাদের সন্দেহ রয়েছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগসহ ঘটনাস্থলের আরও কিছু বিষয় হত্যাকাণ্ডের ভিন্ন কোনো দিকের ইঙ্গিত দিতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
সড়ক অবরোধে অংশ নেওয়া জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান বলেন, চারজন মানুষকে মাত্র দুইজন হ্যাংলা-পাতলা ছেলে কীভাবে হত্যা করল, তা আমাদের স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
আন্দোলনকারীরা জানান, মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা করা হবে। এরপর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন তারা। সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত না হলে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে রোববার বিকেল ৫টার দিকে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে ওই রাতেই মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের স্বীকারোক্তির পর আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আদালতে তারা বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
জবানবন্দি শেষে রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আদালত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে কঠোর পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে তাদের রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।