ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
রংপুরে চার খুন

জবানবন্দিতে উঠে এলো নতুন তথ্য, দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট

ময়নাতদন্তে মা-মেয়ের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:১৯, ২৭ আগস্ট ২০২৬
জবানবন্দিতে উঠে এলো নতুন তথ্য, দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে দেওয়া দুই আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। 

পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনের জন্য ছাদে ওঠার পর ভোরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা পড়ে যান দুই আসামি। এরপর বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান তারা।

বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

Advertisement

ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত মেলেনি

নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তে দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

পুলিশের ভাষ্য, ময়নাতদন্তের ফলাফলের সঙ্গে আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দির বর্ণনারও মিল রয়েছে।

পাশের বাড়ির বাসিন্দা আসামি

পুলিশ কমিশনার জানান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস বলেছেন, তিনি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। অপর আসামি সিদ্ধার্থ দাস একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন।

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি লাগোয়া। গণপতি চক্রবর্তী যে জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। পরে গণপতি চক্রবর্তী ওই জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন।

ঘটনার আগে নিয়মিত ইয়াবা সেবন

পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন।

ঘটনার দিন রাতে তিনি মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সংগ্রহের জন্য শান্ত নামের এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তার বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন তারা। ওই ব্যক্তির পরিচয় পুলিশ পেয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে।

মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা, পরে নেওয়া হয় ১৫ হাজার টাকা

জবানবন্দি অনুযায়ী, ইয়াবা কেনার সময় তারা একটি মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন। পরে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে সিদ্ধার্থের ভাগে পড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।

ইয়াবা সেবনের পর রাত ৩টার দিকে তারা সীমান্তদের বাসা থেকে বের হন। রাস্তায় কুকুর থাকায় সরাসরি না গিয়ে দেয়াল টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন।

দুই ছাদের দূরত্ব ছিল আড়াই ফুট

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেবুদের বাড়ির ছাদটি খোলা ছিল। সেখান থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার সুযোগ ছিল। দুই ছাদের দূরত্ব ছিল আনুমানিক দুই থেকে আড়াই ফুট।

গণপতি চক্রবর্তীর ছাদের চারপাশে হাফওয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। তারা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন শুরু করেন।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দিতে সেদিন মোট আটটি ইয়াবা সেবনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে মুগ্ধের জবানবন্দিতে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা রয়েছে। পুলিশের ধারণা, প্রথমে আটটি ইয়াবা একসঙ্গে এবং পরে আরও একটি সেবন করায় এই পার্থক্য হয়ে থাকতে পারে। দুই আসামিই জানিয়েছেন, এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন।

ভোরে গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা

ইয়াবা সেবন করতে করতে তারা খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখতে পান।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী তাদের ধমক দিয়ে এত সকালে সেখানে কী করছেন জানতে চান। এতে আসামিরা ভয় পেয়ে যান। তারা আশঙ্কা করেন, শিক্ষক চিৎকার করলে বিষয়টি আশপাশের মানুষ জেনে যাবে। মান-সম্মানের ভয় থেকেও তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দেন। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দুই দিক থেকে গামছাটি টান দিলে একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।

শব্দ শুনে ছাদে আসেন স্ত্রী ও মেয়ে

গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ প্রীতিলতার গলা চেপে ধরেন। সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরেন। একপর্যায়ে দুজনেরও মৃত্যু হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই সময় স্থানীয় এক নারী চিৎকারের শব্দ শুনেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পর বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার আগেই তাঁর স্বামী তাকে মারধর করেন বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে।

শিশুটি আসামিকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা

এরপর আসামিরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা।

দোতলায় গিয়ে ঘরের জিনিসপত্র ও আলমারি এলোমেলো করার সময় তারা দেখতে পান, পরিবারের একটি শিশু ঘুম থেকে উঠে গেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে তার নাম ধরে ডাকে।

জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে জানিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা শিশুটিকে বিছানায় ফেলে গলায় কাপড় বা পেটিকোট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

সিসিটিভির আশঙ্কায় বিদ্যুতের তার কাটেন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে এমন আশঙ্কায় আসামিরা নিচতলায় গিয়ে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। তাঁদের ধারণা ছিল, এতে বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেটি বন্ধ হয়ে যাবে।

এরপর তারা আবার ওপরের তলায় গিয়ে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করেন।

স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যান

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে তারা ঘরের ড্রয়ার, আলমারি ও অন্যান্য জিনিসপত্র তছনছ করেন। পরে কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।

জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা আবার ছাদে ওঠেন। সেখান থেকে পাশের দেবুদের বাড়ির ছাদে গিয়ে দেয়াল টপকে বাইরে বেরিয়ে যান।

সিদ্ধার্থ স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে একটি গলিতে চলে যান। পরে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে সেগুলো পুঁতে রাখেন। পুলিশ বলেছে, বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

হত্যার পরও স্বাভাবিকভাবে কাজে যান সিদ্ধার্থ

ঘটনার পর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছ থেকে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন তিনি।

পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবে স্বর্ণের দোকানে কাজে যান। অন্যদিকে মুগ্ধ নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।

জবানবন্দিতে ঘটনার বর্ণনায় মিল

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, সীমান্ত দাসের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি এবং সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বক্তব্যে ঘটনার মূল বর্ণনায় বেশ কিছু মিল রয়েছে।

বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের জন্য ছাদে যাওয়া, গণপতি চক্রবর্তীর হাতে ধরা পড়া, এরপর পরিবারের সদস্যদের একে একে হত্যা এবং হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা এসব বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যে সামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। তবে ইয়াবা সেবনের সংখ্যা নিয়ে দুই আসামির জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: রংপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!