ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

তেলের ধাক্কায় বাড়ছে কৃষি ব্যয়, ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৩১, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তেলের ধাক্কায় বাড়ছে কৃষি ব্যয়, ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় কৃষক
জ্বালানি তেল, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় রাজবাড়ীতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগে কৃষকেরা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পদ্মার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা রাজবাড়ীর বিস্তীর্ণ জনপদ কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, সবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদে ব্যস্ত থাকেন জেলার হাজারো কৃষক। তবে জ্বালানি তেল, শ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার চাষাবাদে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসল বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ বপন, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ এবং ফসল কাটার প্রতিটি ধাপেই আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেচযন্ত্র ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনার খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিও মোট উৎপাদন ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলছে।

কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে একই জমিতে চাষ করতে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ বাজারে ফসলের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ছে না। ফলে ভালো ফলন হলেও শেষ পর্যন্ত লাভের বদলে লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

Advertisement

রাজবাড়ীর এক নারী কৃষক মরিয়ম বলেন, “এবার গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। জ্বালানির দামও বেশি। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে গেলে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান।”

কৃষকেরা বলছেন, শুধু কৃষি উপকরণের দাম কমালেই তাদের সমস্যা দূর হবে না। উৎপাদনের পর ফসলের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ বেশি খরচ করে ফসল ফলানোর পর বাজারে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হলে কৃষকের পুরো বছরের শ্রম ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এতে ভবিষ্যতে কৃষিকাজে আগ্রহ হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধান ও আগাম সবজিসহ নানা ফসলের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অনেক ফসলের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে আগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই উঠে আসছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

এদিকে কৃষি উপকরণের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি চলছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কর্মকর্তারা বলছেন, সার ও কীটনাশকের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকদের নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে কৃষি উপকরণ কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাজারে কেউ অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিগত বছরের চেয়ে এ বছর কীটনাশক পর্যাপ্ত আছে। নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে নেওয়ার জন্য কৃষকদের বলা হচ্ছে। কেউ বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”

তবে কৃষকদের মতে, সার, কীটনাশক ও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পাওয়ায় তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই উৎপাদন উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষকদের ভাষ্য, কৃষিকে টেকসই রাখতে উৎপাদন উপকরণের দাম ও শ্রমিকের মজুরি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, সেচ ও জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে পদ্মার পলিমাটিতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয়ও টেকসইভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: রাজবাড়ী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!