ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পদুয়া জমিদারবাড়ি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের তেওয়ারীহাট সংলগ্ন এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়ি। একসময়কার ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর প্রতীক এই জমিদারবাড়ি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে। দেয়ালে জন্মেছে বটগাছের চারা, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দরজা-জানালা, খসে পড়ছে ইট। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে লোহাগাড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন।
স্থানীয় ইতিহাস, জনশ্রুতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় ১০০ কক্ষবিশিষ্ট এই বিশাল জমিদারবাড়ি দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত। একটি অন্দরমহল, যেখানে জমিদার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন। অন্যটি কাচারিঘর, যা জমিদাররা বিচারকার্য পরিচালনা ও প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের কাজে ব্যবহার করতেন। একসময় জমিদারবাড়ির প্রতিটি অংশে ছিল কর্মচাঞ্চল্য ও আভিজাত্যের ছাপ। সময়ের পরিক্রমায় সেই জৌলুশ হারিয়ে ভবনটি এখন অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ময়মনসিংহ থেকে এসে পদুয়ায় বসতি
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৮০ সালের দিকে ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামে এসে লোহাগাড়ার পদুয়ায় বসতি স্থাপন করেন রামমোহন গুপ্ত। সে সময় আরাকান রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকায় স্থানীয় মগ ও চাকমাদের সঙ্গে বাঙালিদের সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রেখে তিনি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাটির নিচে গুপ্তধন পাওয়ার কাহিনিও প্রচলিত আছে। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে ইট, সুরকি ও কাঠের বিম দিয়ে তিনি এই জমিদারবাড়ি বা ‘রাজবাড়ি’ প্রতিষ্ঠা করেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
জমিদারবাড়িটির নির্মাণশৈলী ছিল সে সময়ের তুলনায় বেশ ব্যতিক্রমী। বিশাল আয়তনের ভবন, অসংখ্য কক্ষ, অন্দরমহল, কাচারিঘর ও চারপাশের জলাশয় মিলিয়ে এটি ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জমিদারি স্থাপনা। ভবনটির স্থাপত্য ও নির্মাণকৌশল আজও অতীতের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
কৃষ্ণ খালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস
এই জমিদারবাড়িকে ঘিরে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে নানা ইতিহাস ও জনশ্রুতি। কথিত আছে, জমিদার কৃষ্ণ গুপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি নির্মাণের কাঠ আনা-নেওয়ার সুবিধার্থে ‘কৃষ্ণ খাল’ খনন করেন। এ ছাড়া পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে খনন করা হয় বিশাল ‘ঠাকুর দিঘি’ ও পদুয়ার দিঘি। স্থানীয়দের দাবি, ঠাকুর দিঘির আয়তন প্রায় ২২ দশমিক ৪৩ একর।
জমিদারবাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব জলাশয় শুধু পানি সরবরাহের উৎসই ছিল না, বরং স্থানীয় জনজীবন ও পরিবেশের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। পদুয়ার ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ এবং তেওয়ারীহাট প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও জমিদার পরিবারের অবদান রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহ্য
সরেজমিনে দেখা যায়, জমিদারবাড়ির চারপাশে রয়েছে বড় বড় পুকুর ও দিঘি। একসময়কার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার দেয়ালজুড়ে এখন ক্ষয়ের চিহ্ন। কোথাও ইট খসে পড়েছে, কোথাও ভাঙা দরজা-জানালা ঝুলে আছে। পুরোনো দেয়ালের গায়ে জন্মেছে বটগাছের চারা। ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা যায় অবহেলা ও দীর্ঘদিনের অযত্নের ছাপ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই জমিদারবাড়িটির অবক্ষয় শুরু হয়। পরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটিতে টানা ৪০ দিন লুটপাট চলে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ওই সময় মূল্যবান জিনিসপত্র ও পুরাকীর্তি লুটের পাশাপাশি ভবনের ভেতরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এসব ঘটনায় জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাড়িটির পুরোনো মণ্ডপে এখনো ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাস বহনকারী এ স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে এখনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নেও অবদান
স্থানীয়দের দাবি, জমিদার পরিবার পদুয়া এলাকায় বিভিন্ন মন্দির, মসজিদ ও পাঠশালা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছিল। পাশাপাশি পদুয়ার ঐতিহ্যবাহী তেওয়ারীহাট প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও এ পরিবারের নাম জড়িয়ে রয়েছে। চট্টগ্রাম শহর, বান্দরবান, চকরিয়াসহ ভারতেও জমিদার পরিবারের বিপুল ভূ-সম্পত্তি ছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
এসব ইতিহাস ও জনশ্রুতি পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়িকে কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়, বরং এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের
জমিদারবাড়ির নিকটাত্মীয় ও সাংবাদিক পুস্পেন চৌধুরী বলেন, ১৭০০ সালের শেষের দিকে জমিদারি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই হয়তো এ জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করা হয়। এটি একটি অপূর্ব প্রাচীন নিদর্শন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা বাড়িটি দেখতে আসেন। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি প্রাচীন নিদর্শন সম্পর্কে জানতে ও দেখতে পারত। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে এ সুন্দর স্থাপত্য।
লোহাগাড়া মোস্তাফিজুর রহমান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাহীদুর রহমান ভূইয়া বলেন, লোহাগাড়া উপজেলার অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়ি। সরকারিভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই অপূর্ব নিদর্শনটি রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে এটি একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
তিনি মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা গেলে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। এতে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। পদুয়ার জমিদারবাড়িটি লোহাগাড়া তথা চট্টগ্রামের একটি প্রাচীন ইতিহাস। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এ বাড়িটি সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।
এখনই উদ্যোগ না নিলে হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহ্য
ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়ি আজ সময়ের কাছে অসহায়। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে এর স্থাপত্যশৈলী, অন্যদিকে ম্লান হয়ে পড়ছে স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ দ্রুত জমিদারবাড়িটি পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ, স্থাপত্যের জরিপ এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে বাড়িটির ইতিহাস, নির্মাণকাল ও জমিদার পরিবারের অবদান নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগে পদুয়া গুপ্ত জমিদারবাড়ি সংরক্ষিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে লোহাগাড়ার অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নইলে কালের সাক্ষী এই প্রাচীন স্থাপনাটিও একদিন হারিয়ে যেতে পারে বিস্মৃতির অতলে।