ঢাকা,  রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

শেরপুরে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নতুন ঘর পেলেন বিধবা আকলিমা

বৃষ্টির রাতে ঘরে পানি পড়ত, এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২০:১৯, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
শেরপুরে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নতুন ঘর পেলেন বিধবা আকলিমা
জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নে নির্মিত ঘর ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বৃষ্টি হলেই দুশ্চিন্তা বাড়ত আকলিমা বেগমের। আকাশে মেঘ জমলেই যেন বুকের ভেতর কাঁপন ধরত। কখন ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়বে, কোথায় হাঁড়ি-পাতিল আর বালতি বসিয়ে সেই পানি ঠেকাবেন—এসব চিন্তায় কাটত তাঁর সময়। জরাজীর্ণ ঘরটিতে বৃষ্টি থেকে বাঁচার ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না ঘরটি মেরামত করার সামর্থ্যও। অভাবের সংসারে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু নিয়েই কাটছিল তাঁর জীবন।

এখন সেই দুশ্চিন্তা কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামের এই অসহায় বিধবা নারী পেয়েছেন নতুন ঘর। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের উদ্যোগে নির্মিত ঘরটি পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে তাঁর জীবনে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এবার অন্তত বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ার ভয় নিয়ে থাকতে হবে না তাকে।

আকলিমা বেগমের স্বামী আব্দুস সামাদ ছিলেন দিনমজুর। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি মারা যান। এরপর থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন আকলিমা। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিতে গিয়ে একের পর এক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। বয়স ও অসুস্থতা কেড়ে নিয়েছে কাজ করার সামর্থ্য। নিজের উপার্জন না থাকায় অন্যের ওপর নির্ভর করেই দিন কাটাতে হয়।

আকলিমার দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। তার মেয়ে আজমিনারও জীবন সহজ নয়। স্বামী পরিত্যক্তা আজমিনা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোরকমে মা-মেয়ের সংসার চালান। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা। সবকিছু সামলে জীবন চালিয়ে নেওয়াই তার জন্য কঠিন সংগ্রাম।

এমন পরিস্থিতিতে তাদের কাছে জরাজীর্ণ ঘরটিই ছিল একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ও ছিল অনিরাপদ। বৃষ্টি হলেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত। ঘরের ভেতরে পাত্র বসিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করতেন তাঁরা। অথচ নতুন করে ঘর নির্মাণ কিংবা পুরোনো ঘরটি সংস্কার করার মতো অর্থ ছিল না তাঁদের হাতে।

আকলিমা বেগমের এই দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নজরে আসে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের। পরে তিনি আকলিমার জন্য নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ইতিমধ্যে ঘরটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

নতুন ঘর পেয়ে আবেগাপ্লুত আকলিমা বেগম। তার কাছে এই ঘর শুধু টিন ও কাঠের তৈরি একটি আশ্রয় নয়; এটি নিরাপদে বেঁচে থাকার অবলম্বন, অনিশ্চয়তার মধ্যে একটু স্বস্তি এবং আগামী দিনগুলো নতুন করে দেখার সাহস।

আকলিমা বেগম বলেন, ‘আমার ঘরটি ভেঙে গিয়েছিল। বৃষ্টি হলে খুব কষ্ট হতো। ঘরের ভেতর পানি পড়ত। নতুন ঘর পেয়ে আমি অনেক খুশি। জেলা প্রশাসক আমার জন্য যে ব্যবস্থা করেছেন, তা কোনো দিন ভুলব না। আল্লাহ যেন তাকে দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা দান করেন।’

একজন অসহায় বিধবা নারীর মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। আকলিমার মতো অসহায় মানুষের জীবনে এমন উদ্যোগ শুধু একটি ঘরের ব্যবস্থা করে না, ফিরিয়ে দেয় নিরাপত্তা ও স্বস্তিতে বেঁচে থাকার আশাও।

বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না। কখনো কখনো মানুষের পাশে দাঁড়ানো কারও একটি উদ্যোগই বদলে দিতে পারে অসহায় মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা। আকলিমা বেগমের নতুন ঘর পাওয়ার গল্প যেন সেই মানবিকতারই একটি উদাহরণ।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মিস ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সমাজের যেসব মানুষ অর্থের অভাবে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা প্রয়োজন। আকলিমা বেগমের দুরবস্থার কথা জানার পর তার মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা এবং তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে পারাই আমাদের কাজের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। ভবিষ্যতেও অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা থাকবে।’
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/শেরপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!