কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। আরো দেখা গেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণের ৪২ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়ছে। যদিও ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ শতাংশের কম।
অনিয়মের কারণে আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ গত মাসে পুনর্গঠন করে এস আলমমুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকটিতে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু এরপরেও ব্যাংকটিতে এস আলমের প্রভাব আগের মতোই রয়ে গেছে। এ কারণে পরিচালকেরা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
.png)
নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, ব্যাংকটি স্বয়ংক্রিয় তথ্যভাণ্ডার থেকে এস আলমসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও লেনদেনের তথ্য মুছে ফেলেছে, ফলে প্রকৃত তথ্য বের করা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এস আলমের ঋণ ও আমানতের তথ্য সঠিকভাবে পাচ্ছেন না, যা ব্যাংকটির বাস্তব চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এস আলমের পক্ষ থেকে ব্যাংকটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোকাম্মেল হক চৌধুরী, যিনি ২০২০ সাল থেকে এই পদে রয়েছেন। এর আগে তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে কাজ করেছিলেন, যেখানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম।
মোকাম্মেল হক চৌধুরী ব্যাংক দখল, অর্থ লুটপাট এবং অর্থ পাচারে সাইফুল আলমের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং বিদায়ী সরকারের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই গ্রুপের অন্য সদস্য এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ, দুজনেই ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন। পরে আহসানুল আলম ইসলামী ব্যাংকের এবং বেলাল আহমেদ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এসব ব্যাংকও এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়েছে।
২০১৩ সালে বেসরকারি ইউনিয়ন ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের দিকে নজর দিতে শুরু করে এবং নামসর্বস্ব ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ঋণের নামে টাকা তুলে নেয়। জনবল নিয়োগে বিশেষভাবে চট্টগ্রামের পটিয়ার ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিস্থিতি ২০২০ সালে আরো খারাপ হয় যখন মোকাম্মেল হক চৌধুরী ব্যাংকটির এমডি হিসেবে যোগ দেন, যিনি চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও এস আলম পরিবারের আত্মীয়।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্ট পরিদর্শন করেন এবং কাগজপত্রে থাকা পরিমাণের তুলনায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা কম পান। নিয়ম অনুযায়ী, ভল্টে টাকার গরমিল হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা, কিন্তু তখনকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। এর মধ্যে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে মোকাম্মেল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের ভিত্তিতে ঋণের তথ্য পর্যালোচনা করে জানায়, ব্যাংকটির বিতরণ করা ১৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হতে পারে, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিতরণ করা অধিকাংশ ঋণই অনিয়মযোগ্য। প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে তা আদায় করতে পারছে না এবং অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সও ছিল না। রাজধানীর বিভিন্ন শাখা, যেমন পান্থপথ, গুলশান ও বনানী, থেকে এই অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ নথিপত্র ব্যাংকের কাছে নেই এবং অনেক ঋণ অনুমোদন ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছে।