মাসিক চক্রে হরমোনের ওঠানামা, শরীর ও মনে প্রভাব পড়ে
নারীর শরীরে হরমোনের মাত্রা প্রতিদিন এক থাকে না। মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, এলএইচ (LH) ও এফএসএইচ (FSH)-এর স্বাভাবিক ওঠানামা ঘটে। এর প্রভাব পড়তে পারে মেজাজ, ক্ষুধা, ঘুম, শক্তির মাত্রা ও ব্যায়ামের পর পুনরুদ্ধারের ওপর।
নারীর শরীরে হরমোনের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। বিশেষ করে মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রজনন-সম্পর্কিত হরমোনগুলোর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমেরও কিছুটা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে কী ঘটে
.png)
- মাসিকের প্রথম দিন থেকে নতুন একটি চক্র শুরু হয়। এ সময় এফএসএইচের প্রভাবে ডিম্বাশয়ে ফলিকল বা ডিম্বাণুর থলি বিকশিত হতে শুরু করে। একই সময়ে ইস্ট্রোজেনের মাত্রাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
চক্রের মাঝামাঝি সময়ে ইস্ট্রোজেনের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের বৃদ্ধি এলএইচের আকস্মিক বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সাধারণত ডিম্বস্ফোটনের সূচনা করে। এরপর চক্রের দ্বিতীয়ার্ধে প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বাড়ে। গর্ভধারণ না হলে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যায় এবং পরবর্তী মাসিক শুরু হয়।
এই হরমোনগত পরিবর্তন শুধু প্রজননব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কিছু নারীর ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ক্ষুধা, খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, মেজাজ, ঘুম বা দৈনন্দিন শক্তির মাত্রায় পরিবর্তন অনুভূত হতে পারে।
ব্যায়াম ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও কি প্রভাব পড়ে?
মাসিক চক্রের সঙ্গে ব্যায়াম করার অভিজ্ঞতায় ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকতে পারে। কোনো কোনো নারী চক্রের নির্দিষ্ট সময়ে বেশি ক্লান্তি, অস্বস্তি বা কর্মক্ষমতার পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন। আবার অনেকের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে।
তাই মাসিক চক্রের নির্দিষ্ট পর্যায়ের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যায়াম বা খাবারের নিয়ম নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। বরং নিজের উপসর্গ, শক্তির মাত্রা, ঘুম ও সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২৮ দিনের চক্রই কি স্বাভাবিক?
মাসিক চক্রের ক্ষেত্রে ২৮ দিনকে প্রায়ই আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে বাস্তবে সব নারীর চক্র ২৮ দিনের হবে—এমন নয়। চক্রের দৈর্ঘ্য ব্যক্তি ও বয়সভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
তাই শুধু ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনকে মিলিয়ে দেখার পরিবর্তে ব্যক্তির নিজস্ব চক্রের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের শরীরকে বোঝা কেন জরুরি
মাসিক চক্র সম্পর্কে সচেতনতার উদ্দেশ্য প্রতিটি পর্যায়ের জন্য কঠোর খাদ্যনিয়ম বা জীবনযাপনের বিধি তৈরি করা নয়। বরং শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের যত্ন নেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
ক্ষুধা, ঘুম, মেজাজ, মাসিকের উপসর্গ বা ব্যায়ামের সক্ষমতায় নিয়মিত কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে তা নোট করে রাখা নিজের শরীরের ধরণ বুঝতে সহায়ক হতে পারে।
তবে অত্যধিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত থাকা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টিকে শুধু ‘হরমোনের স্বাভাবিক পরিবর্তন’ হিসেবে না দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
হরমোনের ওঠানামা নারীর শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই মাসিক চক্রকে শুধু একটি তারিখের হিসাব হিসেবে না দেখে শরীরের পরিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
লেখক : ফিটনেস পুষ্টিবিদ রাইসা মেহজাবীন
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ