ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাক্ষাৎকার ]

‘অর্জন বড় নয়, দায়িত্ব পালনই মুখ্য’

শাহেদ মাহমুদ, শেকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:৫০, ১০ ডিসেম্বর ২০২২
‘অর্জন বড় নয়, দায়িত্ব পালনই মুখ্য’
অধ্যাপক ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক গবেষণা বিষয়ক কোম্পানি ক্লারিভেট অ্যানালিটিক্‌স প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ০.১ শতাংশ হাইলি সাইটেড গবেষকদের তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশি গবেষক হিসেবে রয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান। তার এই অর্জন ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাবান্ধব করে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেকৃবি প্রতিনিধি শাহেদ মাহমুদ

ডেইলি বাংলাদেশ: ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কেমন আছেন?

Advertisement

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: ডেইলি বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ, আমি ভালো আছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: ক্লারিভেট অনুযায়ী এবছর বাংলাদেশ থেকে হাইলি সাইটডে গবেষক হিসেবে শুধু আপনি রয়েছেন। আপনার এই অর্জনে অনুভূতি কেমন?  

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: অর্জনটা বড় কথা নয়, একজন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে কি না সেটাই মুখ্য। আমাদের প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকতা করা এবং গবেষণা। তবে এত ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে গবেষণায় সময় দেওয়াটা আসলেই কষ্টসাধ্য। অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গবেষণায় ততটা সময় দিতে পারে না। এর মধ্যে থেকেই আমরা একটু কিছু করবার চেষ্টা করি। তবে আমার ব্যক্তিগত অর্জন বলতে কিছু নেই, আমার কাজে তো সবারই সহযোগিতা আছে। আমার দেশও তো আমাকে সহযোগিতা করছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: সংখ্যাটা বাংলাদেশে একজন, যেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রয়েছে ২৩৩ জন। তাহলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ কি গবেষণাপ্রিয় নন?  

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: কখনোই এমন নয় যে আমরা গবেষণা প্রিয় নই। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনেকেই আছেন যারা গবেষণা করেই যাচ্ছেন। তবে আমাদের দেশে গবেষণার সংস্কৃতিটা এখনও শক্তিশালী নয়। অর্থনৈতিক সমস্যা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণের গবেষণার জন্য প্রধান বাধার সৃষ্টি করে। তাছাড়াও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের  ক্ষেত্রে প্রভাষক নিয়োগ হয়, তবে বিদেশে শুধু গবেষণার জন্যও বিশেষ অধ্যাপক নিয়োগ হয়ে থাকে, যারা শুধু গবেষণা করবেন।  আমাদের দেশে এমন নয়। তাছাড়াও গবেষণায় আগ্রহীরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় আসলে গবেষণার মান বৃদ্ধি পাবে।  

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রিসার্স প্রফেসর নিয়োগ দেওয়ার বাধাগুলো কি?

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে দেখবে এখানে ছাত্র সংখ্যা অনেক বেশি। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকা উচিৎ। তবে আমাদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা কোথাও কোথাও ষাটোর্ধও রয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনায়, আমাদের অধ্যাপকদেরও সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০টি ক্লাস নিতে হয়। তবে কি আমাদের সে সুযোগটি তৈরি করে দেওয়া কঠিন নয়? আমাদের সুপারভাইজড শিক্ষার্থী সংখ্যাও বেশি। আমার ব্যক্তিগতভাবেই ১৮ বছরে শিক্ষকতায় সুপারভাইজ ও কো-সুপারভাইজসহ ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী হয়ে যাবে। যেটা বিদেশি অধ্যাপকগণ কখনোই করবেন না। সব মিলিয়ে আমাদের বাধা রয়েছে অনেক। তবে এর ভেতরেই আমাদের নিজের কাজটা করে যেতে হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: শিক্ষার্থীদের মানসিকতাও গবেষণাবিমুখ, এক্ষেত্রে পরিবর্তন কিভাবে আনা যেতে পারে?

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা খুব একটা সহজ নয়। আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত পরিবারের। তারা চাইবেই দ্রুত কোনো চাকরি পেয়ে পরিবারের জন্য কিছু করতে। সেখানে গবেষণা নির্ভর চাকরি পাবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়াটা সত্যিই কঠিন। আমাদেরও ফান্ডিং করবার সুযোগ নেই যেখানে থেকে আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে ধারাবাহিক গবেষণায় সহযোগিতা করে যাব। 

আমার জানা এমন একজন আছেন যিনি একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বছর ল্যাবে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এভাবে সময় দেয়াটা সম্ভব নয়। অনেক পটেনশিয়াল গবেষক আমাদের ছাত্রদের মধ্যেও রয়েছে কিন্তু তাদের একজন গবেষক হয়ে ওঠায় অনেক বাধা থেকে যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও হাতে-কলমে শিক্ষা কম, এক্ষেত্রে উত্তরণের উপায় কি?

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক। কিন্তু আমরা শুধু কৃষি অনুষদে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করায়। এতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে হাতে কলমে শিক্ষা সঠিকভাবে দেয়াটাও একটি চ্যালেঞ্জ। এমনকি গ্রুপ করে করলেও কোনো একটি কাজ করতে আমাদের ১০ দিন লেগে যাচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের ক্লাসও রেগুলার করতে হচ্ছে। আসলে সব বিষয় আমাদের সমন্বয় করতে হচ্ছে এতকিছুর মধ্যেও। তবুও আমরা চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য।   

ডেইলি বাংলাদেশ: র‍্যাংকিং এ আমরা পিছিয়ে থাকার কারণ কি?

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: আসলে র‍্যাংকিং যেসব ক্রাইটেরিয়াগুলো থাকে সেগুলো আমাদের পূর্ণ না হওয়াই এমন হয়। তাছাড়াও আমাদের ডুকুমেন্টেশন এর ঘাটতি থাকতে থাকতে পারে। এমন নয় যে আমরা পিছিয়ে, তবে যেসব বিষয় বিবেচনায় র‍্যাংকিং হয় হয়ত সেগুলো আমাদের পূর্ণ হয়নি। তবে এখন আমাদের পাবলিকেশন বৃদ্ধি পাচ্ছে, হয়ত দ্রুতই আমরাও র‍্যাংকিং এ এগিয়ে আসব বলে আশা করছি।  

ডেইলি বাংলাদেশ: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণামুখর করে তুলতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: এক্ষেত্রে গবেষকদের পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে হবে। গবেষণায় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করবার জন্য সেমিনার, ওয়ার্কশপ করতে হবে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোলাবরেশন এবং নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করতে হবে। গবেষণার সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহিতার জায়গাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারব বলে আশা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান: ডেইলি বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!