ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ সাক্ষাৎকার ]

আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্স দিয়ে শুরু- ওমর খালিদ রুমি

ওমর খালিদ রুমি
প্রকাশিত: ১১:১৬, ৯ আগস্ট ২০২৬
আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্স দিয়ে শুরু- ওমর খালিদ রুমি
সঙ্গীত ও ভ্রমণ বিষয়ে আমি অনেকদিন ধরে লেখালেখি করছি। বাংলাদেশ এবং ওয়েস্টার্ন মিউজিক নিয়ে লেখা একটি বই বাজারে এসেছে গত বছর। এর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করার পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাস আর আমার জীবন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে।

ওমর খালিদ রুমি দেশের প্রাক্তন জাতীয় ক্রিকেটার, ব্যান্ড মিউজিশিয়ান, চিন্তাবিদ এবং লেখক। ক্রীড়া, সঙ্গীত এবং লেখালেখি— সব মিলিয়ে এক অনন্য জীবন যাপন করছেন। তার আত্মজৈবনিক রচনা ‘অর্থাৎ’ প্রকাশিত হয়েছিলো প্রায় তিন দশক আগে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ ‘ব্যান্ড মিউজিক ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ইতিহাস’। অচিরেই আসছে নৃতত্ত্ব এবং ভ্রমণ বিষয়ক ইংরেজি গ্রন্থ। তার স্ত্রী একুশে পদকে সম্মানিত চিত্রশিল্পী অধ্যাপিকা রোকেয়া সুলতানা, কন্যা ফারিবা ওমর লরা। এসবের বাইরে ওমর খালিদ রুমি দেশের একজন শীর্ষ গিটারশিল্পী। গিটারের সঙ্গে তার বসবাস ষাট বছরের। জীবনের নানা দিক, লেখালেখি ও সংগীতের পথচলা নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- রায়হান উল্লাহ
 

প্রশ্ন : সঙ্গীত জীবনের সূচনা সম্পর্কে কিছু বলুন।  

ওমর খালিদ রুমি : শৈশব থেকেই গানবাজনা ভালো লাগতো। মাঝেমধ্যেই রেডিওতে গান বাজলে গানের সঙ্গে গলা মেলাতাম। ১৯৫৭-৫৮ সালে যখন আজিমপুরে থাকি তখন দূর থেকে মাইকে গান বাজতো আর আমিও মন দিয়ে গানগুলো শুনতাম। অত্যন্ত মধুর লাগতো। কিছুদিন পর ঘরে রেডিও এলে নিয়মিত গান শুনে মুখস্ত করতাম। বাবার বদলির চাকরি সূত্রে কিছুদিন ফরিদপুর, এরপর সিলেটে স্কুল শুরু করি। সেইসঙ্গে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ বাড়তে থাকে। সিলেটেই প্রথম তবলা এবং ব্যাঞ্জোর সঙ্গে হাতেকলমে পরিচয় হয়। তালযন্ত্রের সঙ্গে অনুশীলনও শুরু হলো। বন্ধুরা অনেকেই জেনে গেছে যে আমি গান গাই। একদিন ক্লাসেও শিক্ষকের অনুরোধে গান গাইলাম। স্কুলের প্রোগ্রামেও ব্যাঞ্জো বাজিয়ে গান করলাম। শুরু হলো সঙ্গীতের সঙ্গে পথচলা। 

প্রশ্ন : ছেলেবেলায় কোন কোন উস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছিলেন? 

রুমি : তবলায় হাতেখড়ি নিজ থেকেই। সিলেট ফাইন আর্টস স্কুলে অবশ্য পেয়েছিলাম দুর্দান্ত তবলা বাদক কামেশ্বর সিংকে। তার কাছ থেকে তালিম পেলাম। বাবার বন্ধু অ্যাডভোকেট সাঈদ আলীর স্ত্রীর কাছে ব্যাঞ্জোর প্রাতিষ্ঠানিক তালিম নিলাম। তবলার পাশাপাশি স্টেজে ব্যাঞ্জোও বাজাতাম। কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রোগ্রামেও একদিন বাজিয়ে ফেললাম। কামেশ্বর সিং এবং সাঈদ চাচার স্ত্রীই ছিলেন প্রকৃতপক্ষে আমার প্রথম সঙ্গীতগুরু। তবে আমার বাবার মধ্যেও সুরের প্রতি অনুরাগ ছিলো। তিনিও গুণগুণ করে মাঝেমধ্যে গাইতেন। বস্তুত তার কাছ থেকেই আমার মধ্যে সুরের বীজ অংকুরিত হয়েছে। 

প্রশ্ন : আমরা জানি যে গিটারের সঙ্গে আপনার অনেক যুগের সম্পর্ক। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

রুমি : জীবনে প্রথম কনসার্ট দেখলাম ১৯৬৫-তে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। ব্যান্ড গ্রুপের নাম ছিলো আয়োলাইটস। এই গ্রুপের কাজল পরবর্তী সময়ে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে ওঠে। ওর গিটার বাদন অবিশ্বাস্য সুন্দর ছিলো। তবলা ব্যাঞ্জোর থেকেও গিটারের প্রতি আমার নেশা জাগতে থাকে। নিজের মধ্যে জেদ জাগলো গিটার আমাকে শিখতেই হবে। গোটা ঢাকা শহর চষে বেড়ালাম একটা স্প্যানিশ গিটার কেনার জন্যে। না পেয়ে হাওয়াইয়ান গিটার দিয়েই শুরু করলাম। পরে এটাকেই স্প্যানিশ গিটারে রূপান্তর করে চর্চা চালিয়ে গেলাম। আমার আরেক বন্ধু শাহেদকে দিয়ে ইংল্যান্ড থেকে গিটারের বই আনিয়ে কর্ড শেখা শুরু করলাম। 

এটা ১৯৬৫-৬৬ সালের কথা। অর্থাৎ গিটারের সঙ্গে আমার বসবাসের ৬০ বছর হতে চললো। ১৯৭০-এ যখন কয়েক বন্ধু মিলে ব্যান্ড গ্রুপ করলাম তখন অবশ্য ইলেকট্রিক গিটার দিয়েই শুরু করেছিলাম। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম ব্যান্ড গ্রুপ আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্স শুরু করলাম ১৯৭২-এ, সে বছরই প্রথম শো করি হোটেল পূর্বাণীতে। 

প্রশ্ন : বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের সঙ্গে পাশ্চাত্য গানের নিবিড় সম্পর্ক আছে। আপনিও এর ব্যতিক্রম নন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

রুমি : ছোটবেলা থেকেই পাশ্চাত্য গান ভালো লাগতো। ষাটের দশকের শুরুতে কুমিল্লায় থাকাকালীন বাংলা গানের পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন মিউজিকও শুনতাম। আর ঢাকায় আসার পর বিভিন্ন কনসার্ট দেখতে দেখতে পাশ্চাত্য ধারার গানের প্রতি ঝোঁক তৈরী হলো। গিটার হাতে নেওয়ার পর পাশ্চাত্য গানের প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে গেল। রেডিও এবং লংপ্লে ছিলো পাশ্চাত্য গান শোনা এবং তোলার অন্যতম মাধ্যম। গানের সুর প্রথম টানতো, পরে বাণী বোঝার প্রতি জোর দিলাম। মানুষের কানে প্রথম প্রবেশ করে সুর, এরপর বাণী। এক পর্যায়ে গিটার দিয়ে ইংরেজি গান তোলা শুরু করলাম, গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে কেবল ইংরেজি গানই গাইতাম গিটার বাজিয়ে। 

প্রশ্ন :  ক্রিকেট, মিউজিক এবং চাকরি— এগুলো কীভাবে সামলেছেন?

রুমি :  ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় ১৯৬২ সালে, সিলেটে থাকা অবস্থায়। আর সিরিয়াস ক্রিকেট খেলা শুরু করি ১৯৬৮ থেকে। পাশাপাশি ব্যান্ড মিউজিক প্রাকটিস পারফরম্যান্স চলতে থাকে। এক পর্যায়ে দিনে সিরিয়াস ক্রিকেট, রাতে সিরিয়াস মিউজিক, যেহেতু রাতে প্রায়ই শো থাকতো, ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমাদের ব্যান্ডের শো থাকতো। প্রথম চাকরি স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনে, পরে বিমানে। চাকরি, ক্রিকেট এবং মিউজিক— সমানতালে চললো। প্রত্যেকটা বিষয় আমি উপভোগ করেছি। উপভোগ না করলে সমন্বয় করতে পারতাম না। এখন যেহেতু ক্রিকেটে নেই, তাই লেখালেখি করছি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। 

প্রশ্ন : ভোকাল, গিটারের পাশাপাশি আপনি গানও লিখতেন।

রুমি : গান লেখা শুরু করি ১৯৮৩ সালে, রেনেসাঁ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর। প্রথমে ইংরেজি গান লিখতাম। পরে বাংলা গানও শুরু করি। এখনো লিখছি।  

প্রশ্ন : সঙ্গীত নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা আছে? 

রুমি : ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডির যুগ শেষ। এখন সারা পৃথিবীতে সবার টার্গেট ইউটিউব। আমিও চেষ্টা করছি আমার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে বিভিন্ন সময় গাওয়া গানগুলো আপলোড করে রাখতে। সেই আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভার্স থেকে বর্তমান ব্যান্ড বাংলাদেশের বিভিন্ন গান ইউটিউবে আপলোড করে যাচ্ছি। আমার মেয়ে লরাও একজন সঙ্গীতশিল্পী। সেগুলোও ইউটিউবে আমার চ্যানেলে আছে। বাংলাদেশ ব্যান্ড নিয়ে দেশের বাইরে একটা কনসার্ট করার ইচ্ছা আছে। 

প্রশ্ন : ব্যান্ড মিউজিক এবং লোকগান একটা অন্যটার সঙ্গে দারুণভাবে যুক্ত বলে আমরা জানি। বিষয়টি আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

রুমি :  লোকসাহিত্য বা ফোকলোর আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা ঐতিহ্যের অংশ। অনেক ব্যান্ডের গানে লোক অঙ্গের গান প্রাধান্য পাচ্ছে। এক সময় ঢাকাভিত্তিক ব্যান্ডে ‘সাধের লাউ’ ছিলো অন্যতম জনপ্রিয় গান। মান্না দে’র ‘জীবনে কী পাবো না’ সবাই গাইতেন। অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ডে আঞ্চলিক গান, লোকজ উপাদান সমৃদ্ধ বাণী আজো ব্যবহৃত হচ্ছে। সেগুলো দর্শক-শ্রোতা পছন্দও করছে। পাশ্চাত্যেও কান্ট্রি সং অনেক জনপ্রিয়। মার্কিন অনেক লোকগান বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়েছে। পরিবেশনায় আধুনিকতা এলেও লোকগানের জনপ্রিয়তা একচুলও কমেনি। আমাদের দেশে যখন ব্যান্ড মিউজিক তুমুল জনপ্রিয় তখনো আবদুর রহমান বয়াতি, মুজিব পরদেশী, রাধারমণ দত্তের গান সমান্তরালভাবে জনপ্রিয় ছিলো এবং আছে। একই সঙ্গে পঞ্চকবির গান, লালন-হাছন-উকিল মুন্সির গানও চলমান। ব্যান্ডের অনেক জনপ্রিয় গায়ক বড় কবিদের রচনাকে গানে রূপ দিয়ে গেয়েছেন এবং সেগুলো জনপ্রিয় হয়েছে।

প্রশ্ন : অনেকদিন ধরেই সঙ্গীত বিষয়ক লেখালেখির সঙ্গে আপনি জড়িত। এ সংক্রান্ত যে প্রকাশনাটি সম্প্রতি বাজারে এসেছে সেটি সম্পর্কে জানতে চাই।

রুমি : সঙ্গীত ও ভ্রমণ বিষয়ে আমি অনেকদিন ধরে লেখালেখি করছি। বাংলাদেশ এবং ওয়েস্টার্ন মিউজিক নিয়ে লেখা একটি বই বাজারে এসেছে গত বছর। এর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করার পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাস আর আমার জীবন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। ভ্রমণ গদ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং নৃতত্ত্ব আমার আগ্রহের জায়গা। সবগুলো বিষয় নিয়ে একটা ইংরেজি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছি। চূড়ান্ত সম্পাদনা চলছে। এই বইয়ে আমি প্রচলিত অনেক ইতিহাস ও মিথকে চ্যালেঞ্জ করেছি। 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!