অপ্রতীম হত্যা: যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের (১৩) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে।
আটককৃতরা হলেন তুহিন, শাহরিয়ার আনাস এবং ফাহিম আহমেদ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও মোবাইলের তথ্য যাচাই করে প্রথমে তুহিনকে আটক করা হয় এবং তার দেওয়া তথ্যে তুহিনের বাড়ি থেকেই অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে আনাস ও ফাহিমকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।
.png)
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপ্রতীম বাসা থেকে বের হওয়ার পর তুহিনের সঙ্গে দেখা করেছিল। তারা একসাথে চলাফেরা করত এবং তুহিনের সাথেই দেখা করতে ওইদিন বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতীম ।তবে হত্যাকাণ্ডে তুহিনের সুনির্দিষ্ট সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তাধীন।
আইফোন উদ্ধার ও সন্দেহভাজনদের আটকের পর বাহ্যিকভাবে এটিকে কেবল ছিনতাই মনে হলেও, ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে নতুন নতুন তথ্য ও জটিল হিসাব। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও পুলিশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন রয়ে গেছে :
প্রক্টর মায়ের ওপর পুরোনো আক্রোশ ও মাদকচক্রের প্রতিশোধ?
জানা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মাদক সেবনের সময় সালমানপুর এলাকার আট কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন তিনি। ওই ঘটনার জেরে এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের কেউ কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি শুধুই কিশোরদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা আইফোন ছিনতাই, নাকি ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মায়ের ওপর সেই পুরোনো আক্রোশ ও প্রতিশোধ নিতেই অপ্রতীমকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে?
উদ্দেশ্য কি শুধুই আইফোন নাকি পূর্বপরিকল্পিত আক্রোশ?
একটি আইফোনের লোভ বা তুহিনের সাথে সামান্য বিরোধের কারণেই কি ১৩ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করা হলো, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র ছিল? ফোনটি নেওয়ার পর অপ্রতীমকে কেন গহীন পাহাড়ের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে হলো? এটি কি নিছক একটি তাৎক্ষণিক অপরাধ, নাকি অন্য কোনো আক্রোশ ঢাকা দেওয়ার অজুহাত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নির্জন পাহাড়ে অপ্রতীম কীভাবে পৌঁছাল?
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা পাহাড়ি এলাকাটি অপ্রতীমের বাসা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। সেখানে তাকে কীভাবে বা কী বলে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? সিসিটিভি ফুটেজে তুহিনের সাথে তাকে প্রায় এক ঘণ্টা ক্যাম্পাসের আশেপাশে ঘুরতে দেখা যায়। ছবির বাহানায় নাকি পূর্বের বিরোধ মেটানোর কথা বলে তাকে নির্জন জায়গায় নেওয়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডে আটকদের কার কী ভূমিকা ছিল?
ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তিনজনকে আটক করা হলেও ঘটনাস্থলে ঠিক কতজন উপস্থিত ছিল এবং অপ্রতীমের মাথায় কে বা কারা মারাত্মক আঘাত করেছিল, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী আটক তিনজনের মধ্যে কার পরিকল্পনায় এটি ঘটেছে এবং কার কী সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল, তা তদন্তাধীন।
ফেসবুক পোস্ট ও সন্দেহভাজনদের মানসিকতা:
ঘটনার পর সন্দেহভাজন আনাসের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর শেয়ার করে আনাস লিখেছিলেন 'বাচ্চাদের কাছে দামি জিনিস তার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ'। এটি কি অপরাধ আড়াল করার চতুর চেষ্টা, নাকি নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কোনো কৌশল,তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার বিস্তারিত ও সার্বিক তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আজ দুপুর ১২ টায় সংবাদ সম্মেলন করা হবে। সেখান থেকেই মিলতে পারে এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য রহস্য ও উত্তরহীন প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব।