ঢাকা,  শুক্রবার   ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

দেশে নতুন তিন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৯, ৬ নভেম্বর ২০২৬
দেশে নতুন তিন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
ছবি: সংগৃহীত

দেশে সার উৎপাদন বাড়াতে ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত কারখানাগুলোর মধ্যে ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে সারের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে সারের সরবরাহ বাড়ানো এবং শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে সাতটি সার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

একই অর্থবছরে দেশে টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ও ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। অথচ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন ডিএপি। চাহিদার তুলনায় এ উৎপাদন যথাক্রমে ৯ দশমিক ১০ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ফলে এসব সারের বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে।

এদিকে কৃষকদের কাছে সার সাশ্রয়ী রাখতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিসিআইসির কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারে ২৩ হাজার টাকা, টিএসপিতে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপিতে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের উদ্যোগ

ইউরিয়া সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে ভোলায় নতুন একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটিতে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে কারখানাটি চালু রাখতে প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারখানাটি চালু হলে ইউরিয়া সারের দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত কারখানাটি বাস্তবায়িত হলে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ টন টিএসপি উৎপাদনের পরিকল্পনা

ফসফেটজাত সারের আমদানিনির্ভরতা কমাতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় নতুন টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিএসপি কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৪ লাখ মেট্রিক টন।

বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট ও কারখানার বিভিন্ন সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপন করা গেলে টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সার সরবরাহে স্থানীয় উৎপাদনের অবদান বাড়বে।

পলাশে ইউএফ-৮৫ কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ

নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদনের নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ হাজার মেট্রিক টন।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত কারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজার চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা

নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনাকর্মীদের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসতে পারে। বিশেষ করে নতুন শিল্প অবকাঠামো গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, নতুন কারখানা স্থাপিত হলে নির্মাণকাজ থেকে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে।

সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা গেলে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: বাসস

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!