মৃত্যুর পর সাধারণত স্বজন কিংবা বন্ধুরাই লিখে দেন কারও শেষ বিদায়ের কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের এক ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর আগেই নিজের শোকবার্তা লিখে গেছেন। আর সেই শোকবার্তা প্রকাশের পরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
মাইকেল ডি সিমোন নামে ৫১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ছিলেন দুই সন্তানের বাবা ও সাবেক সেনাসদস্য। তিনি ওয়াশিংটনের অলিম্পিয়ায় বসবাস করতেন। গত ২১ আগস্ট হৃদ্যন্ত্রজনিত সমস্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে বছরের শুরুতে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
.png)
মৃত্যুর আগে নিজের জন্য লেখা শোকবার্তায় ডি সিমোন এমন এক ভঙ্গি বেছে নিয়েছিলেন, যা একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক, আবেগপূর্ণ ও জীবনদর্শনে ভরা।
শোকবার্তার শুরুতেই তিনি লিখেছিলেন, মাইকেল ডি সিমোন দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছেন যে তিনি আর জীবিত নেই।
এরপরই নিজের মৃত্যুকে নিয়ে লিখেছেন, এটি তার পরিকল্পনা ছিল না। তিনি আরও কিছুদিন বেঁচে থেকে অনেক কিছু করার আশা করেছিলেন। কিন্তু তার মন ও শরীরের মধ্যে যেন মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত শরীরের যুক্তিই জয়ী হয়েছে—এমন রসিকতাও করেন তিনি।
নিজের শেষ মুহূর্ত নিয়েও রসিকতা করতে ছাড়েননি ডি সিমোন।
তিনি লিখেছেন, পৃথিবীতে যেভাবে খাবার খেতে খেতে এসেছিলেন, সেভাবেই পিজ্জা খেতে খেতে পৃথিবী ছেড়েছেন।
নিজের বয়স নিয়েও ছিল মজার মন্তব্য। ৫১ বছর বয়স একজন মানুষের জন্য কম হলেও একটি কুকুরের জন্য বেশ ভালো বয়স—এমন তুলনা করে তিনি লিখেছেন, অন্তত এই জেনে তিনি শান্তি পেয়েছেন যে অনেক অনেক কুকুরকে তিনি টিকে গেছেন।
নিজের জীবনের আরেকটি দিকও শোকবার্তায় তুলে ধরেছেন ডি সিমোন। কাজ ও আনন্দের জন্য তিনি বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। শুধু অ্যান্টার্কটিকা বাদ পড়েছিল—কারণ সেটি খুব ঠান্ডা!
নিজের ভ্রমণকে ১২ শতকের একজন অভিজাত ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করে তিনি রসিকতা করে লিখেছেন, সেই সময়ের কোনো রাজার সন্তান না হয়েও তিনি যেন পুরো পৃথিবীই দেখে ফেলেছেন।
শোকবার্তার সবচেয়ে আবেগপূর্ণ অংশে স্ত্রী ডেইজি এবং দুই মেয়ে জোহানা ও ডানির কথা লিখেছেন তিনি।
ডেইজির সঙ্গে হাইস্কুলে পরিচয় থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীতে একসঙ্গে থাকা, সন্তান লালন-পালন এবং পরে নানু-নানি হওয়ার পর্যায় পর্যন্ত তাদের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। স্ত্রীকে তিনি তার ‘প্রিয়তমা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং লিখেছেন, তারা কখনো একে অপরের প্রতি সেই ভালোবাসা হারাননি।
দুই মেয়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে ডি সিমোন লিখেছেন, তাদের জন্য তার ভালোবাসা যেন সৃষ্টির চেয়েও বড়।
তবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় দিকটি যে তার প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়া—সেটিও স্পষ্ট করে লিখেছেন তিনি।
নিজের মৃত্যুসংবাদ নিজেকেই দিতে হওয়া নিয়েও শেষদিকে রসিকতা করেছেন ডি সিমোন।
শোকবার্তার শেষ দিকে তিনি মৃত্যুর খবর জানানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান, এই খবর পাওয়াটা যেমন সুখকর ছিল না, দেওয়াটাও তেমন আনন্দের নয়।
ডি সিমোনের লেখা শোকবার্তাটি দ্য সেন্ট্রালিয়া ক্রনিকল প্রকাশ করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়ে। অনেকেই এটিকে জীবনের অন্যতম সেরা ও ব্যতিক্রমী শোকবার্তা বলে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ এমনও বলেছেন, তাঁকে কখনো না চিনলেও এই লেখা পড়ে মনে হয়েছে যেন মানুষটি সম্পর্কে অনেকটাই জানা হয়ে গেছে।
শুক্রবার ওয়াশিংটনের সেন্ট্রালিয়ায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
মৃত্যুর পর লেখা একটি শোকবার্তা যেখানে শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়ার খবর জানায়, সেখানে মাইকেল ডি সিমোনের নিজের লেখা শেষ কথাগুলো হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন, রসবোধ, ভালোবাসা ও সম্পর্কের এক অনন্য স্মারক।