হাদিসুর ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু...
কি হতে কি হয়ে গেলো। পরার কথা ছিল শেরওয়ানি। অথচ গায়ে উঠল কাফনের কাপড়। বিয়ের সানাইয়ের বদলে প্রিয়জনদের হৃদয়ে বাজছে বিচ্ছেদী সুর। অনন্তলোক থেকে আর কখনো ফিরবেন না ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান। বন্দরে বন্দরে জাহাজ ভিড়লে কিংবা কাজের ফাঁকে আর কখনো মা-বাবাকে মুঠোফোনে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবেন না। ছোট ভাইয়ের থেকেও শুনবেন না, কি লাগবে তোর? কি আনবো আসার সময়?
সবই এখন অতীত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম বাংলাদেশি শহিদ তিনি। বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তার। কিন্তু বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই, তবে লাশ হয়ে।
বরগুনার বেতাগী উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে দাদা-দাদির কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন হাদিসুর। ছেলেকে স্থায়ী ঘরে রাখলেও একটু পরপর কবরের কাছে ছুটে যাচ্ছেন মা-বাবা। যাচ্ছেন স্বজনরাও। কোনো কিছু না দিতে পারলেও স্মৃতি রোমন্থন করে ফেলছেন চোখের জল।
হাদিসুরের খালা শিরিন আক্তার বারবার বলছেন,‘হাদিসুর আমাকে বলেছিল, খালা তোমরা এবার মেয়ে দেখ। আমি বিয়ে করব। এবার আর কোনো আপত্তি করব না। সেই বাবা আমার শেরওয়ানি পরতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশে ফিরল কাফনের কাপড় পরে।’
চার আঙুল কপালে যদি না লেখা থাকে, তবে কি আর সব চাওয়া পূরণ হয়? হয় না। হাদিসুরেরও হয়নি। তাইতো ফিরলেন লাশ হয়েই। এটাই নিয়তি। এটাই অমোঘ সত্যি। তবু আমরা সব ভুলে অহমিকার সাগরে অবগাহন করি। মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন না করে বরং তাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে পৈশাচিক সুখ পাই। মুখে আঁকি চওড়া হাসি। কিন্তু ভুলেও ভাবি না, আমাদের শেষ গন্তব্য ওই সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরই। যেখানে কেউ রবে না, কেউই না। মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন কেউ না। তাহলে কেন এত উচ্চবাচ্য? কেন এত গলাবাজি?
সবাইকেই একদিন ফিরতে হবে, সবাইকেই। সেটা দুদিন আগে আর পরে। তাই লালন সাঁইয়ের সেই গানের কথাটা চলুন একবার মনে করি, সময় গেলে সাধন হবে না। আসলেই হয় না। আর এর হাজারো প্রমাণ রয়েছে, আমার-আপনার আশপাশেই।
চলুন জীবনকে ভালোবাসি, মানুষকে ভালোবাসি। দেখবেন চারপাশ আরো সুন্দর হয়ে গেছে। আরো। সোনালু ফুলের মতো। স্নিগ্ধ গাংচিলের মতো। সেই সঙ্গে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রার্থনা করি, হাদিসুরের মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। গাইতে না হয়, যার চলে যায় সেই বোঝে হায় বিচ্ছেদের কি যন্ত্রণা। হাদিসুরের জন্য নতজানু শ্রদ্ধা, স্যালুট...
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও গীতিকার