এআই কি বাংলাদেশকে নতুন ‘ডিজিটাল কলোনি’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের উর্বর জমি থেকে নীল বা তুলা কাঁচামাল হিসেবে নামমাত্র মূল্যে নিয়ে যেত। সেই কাঁচামাল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিলাতি তৈরি পোশাকে রূপ নিয়ে চড়া মূল্যে আবার এই অঞ্চলের মানুষের কাছেই বিক্রি হতো। শোষণের সেই চাকা বদলেছে কিন্তু তার ভেতরের দর্শনটি কি আসলেই বদলেছে?
একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র যুগে আমরা এক নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল উপনিবেশবাদ’ বা ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের মুখোমুখি। এবার আর কোনো জাহাজ এসে আমাদের বন্দর দখল না করলেও সিলিকন ভ্যালির গুটিকয়েক টেক জায়ান্ট অজান্তেই আমাদের শোবার ঘর থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত দখল করে নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের এই বিস্তার আমাদের সামনে সম্ভাবনার পাশাপাশি তৈরি করছে নতুন কিছু প্রশ্ন—আমাদের বিপুল ডেটার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জায়গা কোথায় এবং ভবিষ্যতের এআই অর্থনীতিতে আমরা প্রযুক্তি নির্মাতা, নাকি কেবল ভোক্তা হয়ে থাকব?
.png)
দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত টেলিনর এশিয়ার ‘ডিজিটাল লাইভস ডিকোডেড: বাংলাদেশ’ গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছেন এবং ৪৪ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, আমাদের এই বিপুল জনসংখ্যা ফ্রিতে যে ডেটা বা তথ্য বিদেশী সার্ভারে জমা দিচ্ছে তা-ই হচ্ছে আধুনিক যুগের সেই ‘নীল’ বা ‘তুলা’। আমাদের আচরণ, ভাষা ও পছন্দ-অপছন্দের এই বিপুল ডেটা ব্যবহার করে গ্লোবাল টেক জায়ান্টরা তাদের এআই মডেলগুলোকে বিলিয়ন ডলারের সম্পদে রূপান্তর করছে। আর পরবর্তীতে সেই এআই চালিত প্রিমিয়াম সেবাগুলোই আমাদের চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে।
এখন আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি এই নতুন এআই সাম্রাজ্যের স্রেফ অবলা ‘ভোক্তা’ এবং ডেটা সরবরাহকারী হয়ে থাকব নাকি নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করব? একজন এআই-নেটিভ বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের তরুণদের যে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে, তা দিয়ে আমরা এই পরনির্ভরশীলতার জাল ছিঁড়ে বের হতে পারি। তবে তার জন্য আমাদের এখনই আত্মতুষ্টির ঘুম থেকে জাগতে হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক এআই ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও সম্ভাবনাগুলো ডাটানির্ভর তিন স্তরে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন: প্রথমত, ডেটার উপনিবেশ ও পরনির্ভরশীলতা: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ICT Access and Use Survey 2024-25 অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে দেশের ৫৪.৮ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার সুবিধার আওতায় এসেছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ও আচরণগত ডেটা সুরক্ষায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা নীতিনির্ধারণের মতো সংবেদনশীল খাতে যদি আমরা সম্পূর্ণ বিদেশী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি তবে আমাদের ভবিষ্যৎ জাতীয় সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রিত হবে বাইরের কোনো শক্তির ডেটা ও মনস্তত্ত্ব দ্বারা।
দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অবলুপ্তি: বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (LLM) মূলত ইংরেজি ভাষা এবং পশ্চিমা মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সেখানে বাংলা ভাষা, আমাদের আঞ্চলিক উপভাষা কিংবা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির সূক্ষ্ম প্রকাশগুলো অনুপস্থিত বা বিকৃত। আমরা যদি নিজস্ব ‘বাংলা এলএলএম’ তৈরি না করি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডিজিটাল মাধ্যমে নিজের ভাষাগত স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলবে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল সোয়েটশপ বা কায়িক শ্রমের ফাঁদ: বৈশ্বিক বাজারে এআই-এর ডেটা লেবেলিং বা সাধারণ প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কম বেতনের ফ্রিল্যান্সিং কাজে আমাদের তরুণরা যুক্ত হচ্ছে। এটি সাময়িক কর্মসংস্থান তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। আমরা যদি কেবল এআই-এর ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার বা ‘ডিজিটাল মজুর’ তৈরিতে আটকে থাকি, তবে মূল বৈশ্বিক লভ্যাংশ চলে যাবে সিলিকন ভ্যালিতেই। আমাদের ‘ডিজিটাল মজুর’ নয়, ‘এআই স্থপতি’ হতে হবে।
তাহলে এই নতুন ডিজিটাল কলোনি হওয়া থেকে মুক্তির উপায় কী? পথ একটাই - ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। সম্প্রতি আইসিটি বিভাগ কর্তৃক জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশিত ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬–২০৩০’-এর খসড়ায় ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া নীতিমালায় বাংলাদেশ যেন গুরুত্বপূর্ণ ডেটা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও এআই ব্যবস্থাপনার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে সে লক্ষ্যকে নীতির একটি মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু খসড়া নীতিমালায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, প্রয়োজন এর বাস্তবসম্মত প্রয়োগ। একই সঙ্গে দেশের এআই অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক বা অন্য একটি নির্ধারিত স্থানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের একটি ফ্রন্টিয়ার এআই ডাটা সেন্টার ও সার্বভৌম কম্পিউটিং অবকাঠামো স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের এআই গবেষণা, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এই ধরনের বড় অবকাঠামোগুলোকে আমাদের নিজস্ব সার্বভৌম এআই এবং ‘বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (Bangla LLM) তৈরির কাজে যুক্ত করতে হবে।
আমাদের দেশের কৃষি, ক্ষুদ্রঋণ কিংবা তৈরি পোশাক খাতের নিজস্ব কিছু জটিলতা ও বৈচিত্র্য রয়েছে। যা স্থানীয় বাস্তবতা না বুঝে তৈরি কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতির খসড়াতেও কৃষি ও শিল্প খাতে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর এআই সেবা পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন নিজস্ব ডেটা, গবেষণা সক্ষমতা এবং হাইপার-লোকাল প্রযুক্তি অবকাঠামো।
একই সঙ্গে প্রয়োজন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ (Personal Data Protection Ordinance) এবং কার্যকর ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামোর বাস্তবায়ন। এর অংশ হিসেবে সংবেদনশীল ডেটার শ্রেণিবিন্যাস, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের সংবেদনশীল ডেটার নিরাপত্তা, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল বেসিক আইটি বা কোডিং শেখানোর প্রথাগত ধারণা থেকে বের করে অ্যাডভান্সড মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক, ডেটা সায়েন্স এবং এআই এথিক্সের দিকে ধাবিত করতে হবে।
আমরা প্রথম তিনটি শিল্পবিপ্লব ধরতে পারিনি। ইন্টারনেট বিপ্লবে আমরা যোগ দিয়েছি অনেক দেরিতে, মূলত ক্রেতা হিসেবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই মহাবিপ্লবে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। হয় আমরা নিজস্ব প্রযুক্তির শক্তিতে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা লিখব না হয় বিশ্বমঞ্চে চিরদিনের জন্য প্রযুক্তিগত দাসত্ব মেনে নেব।
আমাদের মেধা আছে, সুযোগও আছে। এখন প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা এবং দেশীয় উদ্ভাবকদের সাহসিকতা। আসুন, এআই-কে আমাদের কলোনি বানানোর হাতিয়ার হতে না দিয়ে, একে আত্মনির্ভরশীল ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে রূপান্তর করি।
-এরশাদুল হক, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এআই-নেটিভ টেকনোলজি কোম্পানি ‘রাইজআপ ল্যাবস’।