ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

[ মতামত ]

উচ্চারণের পরীক্ষা নয়- কাজের পরীক্ষা নিন

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:৩০, ৭ অক্টোবর ২০২৬
উচ্চারণের পরীক্ষা নয়- কাজের পরীক্ষা নিন
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বরলিপি সংরক্ষণ করে না। ইতিহাস সংরক্ষণ করে মানুষের কাজ, সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতি। আমাদেরও তাই নেতাদের কণ্ঠের চেয়ে তাঁদের কর্মের শব্দ শুনতে শেখা দরকার।

কে কী পোশাক পরলেন, কীভাবে কথা বললেন, কোন শব্দ কীভাবে উচ্চারণ করলেন, কে কতটা সাবলীলভাবে বক্তব্য রাখলেন, এসব নিয়ে আমরা কতটা ব্যস্ত থাকব? নাকি একজন মানুষের কথার চেয়ে তাঁর কাজ এবং সেই কাজের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব?

সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় ভাষণ দেওয়ার পর তাঁর উচ্চারণ, বলার ধরন এবং উচ্চারণের ভুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা, হাসাহাসি ও মিমের বন্যা দেখা গেছে।

ভালো উচ্চারণ অবশ্যই ভালো বিষয়। সুন্দরভাবে কথা বলা, স্পষ্টভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারা একজন মানুষের গুণ। একজন রাষ্ট্রনেতার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন রাষ্ট্রনেতার মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি কি তাঁর উচ্চারণ হওয়া উচিত?

আমি বরং অন্য একটি পরীক্ষার কথা বলতে চাই। কাজের পরীক্ষা। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের আমরা তাঁদের বক্তৃতার সৌন্দর্যের জন্য নয়, তাঁদের কাজের জন্য স্মরণ করি।

মহাত্মা গান্ধী নিজেই তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, জনসমক্ষে কথা বলা তাঁর জন্য একসময় অত্যন্ত কঠিন ছিল। সভায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁপতেন, এমনকি লিখে নিয়ে যাওয়া বক্তৃতাও ঠিকমতো পড়তে পারেননি। 

কিন্তু ইতিহাস গান্ধীকে তাঁর উচ্চারণের জন্য স্মরণ করেনি। স্মরণ করেছে তাঁর কাজ, রাজনৈতিক সংগ্রাম, দর্শন এবং মানুষের ওপর তাঁর প্রভাবের জন্য।

আবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলির দিকে তাকানো যায়। তিনি বক্তৃতার জাদুকর হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সরকারের সময় ব্রিটেনে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যুদ্ধোত্তর ব্রিটিশ সমাজে বড় ধরনের কল্যাণমূলক পরিবর্তন আসে।

  • অন্যদিকে আব্রাহাম লিংকন ছিলেন অসাধারণ বক্তা। তাঁর Gettysburg Address ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত রাজনৈতিক ভাষণ। অর্থাৎ ইতিহাস আমাদের এটাও দেখায় যে ভালো বক্তৃতা এবং ভালো কাজ পরস্পরের বিরোধী নয়। সমস্যা বক্তৃতায় নয়। সমস্যা হলো, বক্তৃতাকে যদি কাজের বিকল্প বানিয়ে ফেলা হয়।

উইনস্টন চার্চিলও ছিলেন অনন্য বক্তা। তাঁর বক্তৃতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ জনগণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু চার্চিলকে শুধু তাঁর কণ্ঠ বা উচ্চারণ দিয়ে বিচার করলে তাঁর ইতিহাসের সামান্য অংশই বোঝা হবে।

অর্থাৎ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে বক্তার ধরন এক নয়। কেউ ছিলেন অসাধারণ বক্তা, কেউ ছিলেন সংযত, কেউ ছিলেন স্বভাবতই সংকোচী। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁদের কথার চেয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত, কর্মকাণ্ড এবং তার ফলাফল নিয়েই বিচার করেছে।

আমার নিজের কর্মজীবনের একটি ঘটনা এখানে মনে পড়ছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে বহু বছর বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করার সময় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাকে একটি সাইট বা প্ল্যান্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমি প্রথমে সেই দায়িত্ব নিতে রাজি হইনি। 

বিষয়টি কোম্পানির নিউইয়র্কের হেড অফিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিজেই আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, কেন আমি এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব নিতে চাইছি না।

আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার ভাষাগত আত্মবিশ্বাস খুব বেশি নয়। আমি ঠিকঠাক কোনো একটি ভাষায়ও খুব সাবলীলভাবে কথা বলতে পারি না। সাধারণত কোনোভাবে ম্যানেজ করে চলি। এত বড় একটি দায়িত্বে গিয়ে যদি কথা বলতে গিয়ে ভুল করি, ভুলভ্রান্তি বলি এবং মানুষ হাসাহাসি শুরু করে, তখন কী হবে?

আমার ধারণা ছিল, আমার এই যুক্তি শুনে তিনি হয়তো আমার সীমাবদ্ধতাটা বুঝবেন। কিন্তু তিনি বরং উল্টো প্রশ্ন করলেন।

তখন ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯৯ শতাংশ কর্মীই সুইডিশ ভাষায় কথা বলতেন এবং তাঁদের অনেকেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ছিলেন। তিনি বললেন, “যেখানে ৯৯ শতাংশ কর্মী কথা বলতে পারে এবং কথা বলায় দক্ষ, সেখানে তোমাকেই কি সবচেয়ে বেশি কথা বলতে হবে?”

তারপর তিনি আরও বললেন, “কোম্পানি একজন টকার খুঁজছে না, একজন ওয়ার্কার খুঁজছে।”

কথাটি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।
শেষ পর্যন্ত আমি দায়িত্বটি গ্রহণ করি।

সেই অভিজ্ঞতা আমাকে কর্মজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে: নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু কীভাবে কথা বলতে হয় তা নয়, কী করতে হবে সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • নেতার কাজ সব কথা নিজে বলা নয়। প্রয়োজনে সঠিক মানুষকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, দক্ষ মানুষকে কাজে লাগানো, সিদ্ধান্ত নেওয়া, দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং ফলাফল নিশ্চিত করাই নেতৃত্বের বড় অংশ।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের রাজনৈতিক আলোচনাকেও আমি দেখি। একজন প্রধানমন্ত্রী একটি শব্দ ভুল উচ্চারণ করলেন। একটি বাক্য বলার সময় জড়িয়ে গেলেন। তাঁর উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থাকল। কিংবা তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ প্রত্যাশামতো হলো না।

এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু আমরা কি এখানেই থেমে যাব? নাকি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করব?

তিনি কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?
সেই সিদ্ধান্তে মানুষের জীবন কীভাবে বদলাচ্ছে?
দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে?
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার কী অবস্থা?
দ্রব্যমূল্য কেন বাড়ছে?
তেল, লবণ, পানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কি একজন নেতার ভুল উচ্চারণের কারণে বাড়ে? অবশ্যই নয়।

  • দাম বাড়ার পেছনে থাকে অর্থনীতি, উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারব্যবস্থা, নীতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসহ বহু কারণ। তাই একজন নেতার উচ্চারণ নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেয়ে সেই কারণগুলো অনুসন্ধান করা অনেক বেশি জরুরি।

একটি ভুল উচ্চারণে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্তে একটি মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। একটি পরিবার নিঃস্ব হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে পারে। একটি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি একটি রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বহু মানুষের জীবনে পৌঁছাতে পারে।

সেখানেই আসল পার্থক্য। ভুল উচ্চারণ সাময়িকভাবে হাসির কারণ হতে পারে। ভুল সিদ্ধান্ত মানুষের কান্নার কারণ হতে পারে।

তাই সমালোচনা অবশ্যই হোক। রাজনীতিবিদদের সমালোচনা হোক, সরকারের সমালোচনা হোক, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা হোক। কিন্তু সমালোচনারও তো একটি নৈতিক দায়িত্ব আছে। আমরা যেন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এত ব্যস্ত না হয়ে যাই যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।

আরেকটি বিষয়ও আমাদের মনে রাখা দরকার। কোনো রাজনৈতিক নেতা নিখুঁত নন। কোনো প্রধানমন্ত্রীও নন। এমনকি কোনো সাধারণ মানুষও নন। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে হাঁটেন, কী পোশাক পরেন, তাঁর কণ্ঠস্বর কেমন, উচ্চারণে কোথায় ভুল হয়, এসব তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হতে পারে। 

কিন্তু একজন রাষ্ট্রনেতার প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেই ক্ষমতা মানুষের কল্যাণে কতটা কাজে লাগছে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ফল কী হচ্ছে, তার ভিত্তিতে।

তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। তিনি কীভাবে উচ্চারণ করলেন, সেটি নিয়ে কয়েক দিন আলোচনা হতে পারে। কিন্তু তাঁর সরকারের কাজের ফলাফল নিয়ে আলোচনা চলতে হবে বছরের পর বছর।

কারণ জনগণ মিম খেয়ে বাঁচে না। জনগণ বাঁচে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, কাজ, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা নিয়ে। একজন কৃষকের কাছে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণের চেয়ে তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শ্রমিকের কাছে কোনো শব্দের উচ্চারণের চেয়ে তাঁর মজুরি এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগীর কাছে বক্তৃতার সৌন্দর্যের চেয়ে হাসপাতালের চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।

  • একজন বেকার তরুণের কাছে রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে একটি সম্মানজনক চাকরির সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। একজন মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপত্তা কোনো নেতার উচ্চারণের চেয়ে অসীম গুরুত্বপূর্ণ।

আর একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে খুব সাধারণ:
“আমার জীবনটা কি একটু ভালো হয়েছে?”
আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে।
আমরা অন্যের উচ্চারণ নিয়ে হাসছি, কিন্তু নিজের কাজ কতটা সঠিক? আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছি, কিন্তু সুযোগ পেলে নিজের স্বার্থে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি কি না? আমরা নৈতিকতার কথা বলছি, কিন্তু নিজের জীবনে নৈতিকতার কতটা চর্চা করছি?

সমস্যা শুধু রাজনীতিবিদদের নয়। সমাজেরও। আমরা অনেক সময় কথাকে কাজের চেয়ে বড় করে দেখি। যে সুন্দর কথা বলতে পারে তাকে জ্ঞানী মনে করি, যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারে তাকে যোগ্য মনে করি, যে ভালোভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে তাকে সফল মনে করি। অথচ নীরবে যে মানুষটি কাজ করে যাচ্ছে, তার কাজের দিকে তাকানোর সময় আমাদের হয় না।

হয়তো এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। উচ্চারণের পরীক্ষা নেবেন না, কাজের পরীক্ষা নিন। কে কত সুন্দর করে বললেন, তার চেয়ে দেখুন তিনি কী করলেন। কে কত সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিলেন, তার চেয়ে দেখুন তিনি কতটা বাস্তবায়ন করলেন। কে কত ভালো বক্তা, তার চেয়ে দেখুন তাঁর সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে কী ফল নিয়ে এলো।

কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বরলিপি সংরক্ষণ করে না। ইতিহাস সংরক্ষণ করে মানুষের কাজ, সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতি। আমাদেরও তাই নেতাদের কণ্ঠের চেয়ে তাঁদের কর্মের শব্দ শুনতে শেখা দরকার।

উচ্চারণ ভুল হতে পারে। কথা জড়িয়ে যেতে পারে। বাক্য অসম্পূর্ণ হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ভুলের মূল্য যেন মানুষকে দিতে না হয়। সেখানেই একজন নেতার আসল পরীক্ষা। উচ্চারণের পরীক্ষা নয়, কাজের পরীক্ষা।


লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
** মতামত লেখকের নিজস্ব, সম্পাদক দায়ী নন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!