ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]

শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তব জীবনের জন্য মানুষ তৈরি করতে পারছে

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১৮:২৫, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তব জীবনের জন্য মানুষ তৈরি করতে পারছে
আমাদের তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তব জীবনের জন্য মানুষ তৈরি করছে? শিক্ষকেরা কি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাচ্ছেন?

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ পড়াশোনা শেষ করেও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। 

প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, বিশ্বজুড়ে কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতির সুফল কারা পাবে, আর এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মূল্য কাদের দিতে হবে?

বাংলাদেশের একজন কম্পিউটার প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হলো। পড়াশোনা শেষ করেও তিনি চাকরি পাচ্ছেন না। তাঁর অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, অর্থ ও সময় ব্যয় করে যখন কর্মজীবন শুরু করার সুযোগ পান না, তখন প্রশ্ন ওঠে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে আসলে কীসের জন্য প্রস্তুত করছে?

এটি শুধু একজন প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা তরুণদের বলি, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো, ভালো ফল করো, দক্ষতা অর্জন করো এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো।

 কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজগতে প্রবেশের উপযুক্ত সুযোগ না থাকলে সেই প্রস্তুতির মূল্য কোথায়? আর যে কর্মজগতে প্রবেশের জন্য তারা এত দিন প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটিই যদি প্রযুক্তির কারণে দ্রুত বদলে যায়, তাহলে তাদের দায়িত্ব কতটুকু এবং রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকর্তাদের দায়িত্ব কতটুকু?

শিক্ষার সঙ্গে কর্মজগতের ব্যবধান

বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার সঙ্গে কাজের চাহিদার অসামঞ্জস্য এবং মানসম্পন্ন চাকরির সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও সেই অনুপাতে উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ উপযুক্ত কাজ পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকটকে শুধু এআইয়ের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ, নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার মান এবং দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগের চাহিদার সামঞ্জস্য, সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এআই যখন কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বদলে দিচ্ছে, তখন আগে থেকেই থাকা এই ব্যবধান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

  • আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? শিক্ষার্থীরা কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য শিখছে, নাকি বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধান খোঁজা, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করছে?
  • শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ দেওয়া নয়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, নতুন কিছু শিখতে এবং সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম করে তোলাই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অথচ শিক্ষা ও কর্মজগতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকলে সনদ অর্জন এবং বাস্তবে কাজ করার সক্ষমতা এক বিষয় হয়ে থাকে না।

এআই যখন কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে

মানুষের তৈরি এআই এখন এমন অনেক কাজ করতে পারে, যেগুলো আগে মানুষের দীর্ঘ সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হতো। তথ্য বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন তৈরি, অনুবাদ, প্রাথমিক নকশা, হিসাব-নিকাশ, সফটওয়্যার উন্নয়নের কিছু ধাপ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কাজে এআই মানুষের সহায়ক হয়ে উঠছে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে, সময় বাঁচতে পারে এবং নতুন কাজের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে কিছু কাজের চাহিদা কমতে পারে, কোনো কোনো পেশায় কর্মীর ভূমিকা বদলে যেতে পারে এবং নতুন কর্মীদের জন্য প্রবেশের পথ সংকুচিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কাজের বড় অংশ নিয়মমাফিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ওপর নির্ভরশীল, সেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

সুইডেনের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা এখানে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সুইডেনের সরকারি সংস্থা ‘বৃদ্ধি ও উন্নয়ন বিশ্লেষণ কর্তৃপক্ষ’ (Tillväxtanalys) এবং Uppsala University প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণদের শ্রমবাজারে প্রবেশ করা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। 

তাঁদের আয়ের অগ্রগতিও তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে। তবে গবেষণাটি সামগ্রিক সুইডিশ শ্রমবাজারে ব্যাপক এআই-চালিত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ পায়নি।

এই গবেষণাকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। দুই দেশের অর্থনীতি, শিল্পের কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজার এক নয়। তবু গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়: প্রযুক্তির পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর একইভাবে পড়ে না। কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান অবস্থানের কারণে কিছু সুবিধা পেতে পারেন, অথচ সদ্য স্নাতক তরুণদের প্রথম চাকরিতে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি আরও জরুরি। আমরা কি এআইয়ের প্রভাব সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করছি? কোন পেশায় কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং নতুন কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ কোথায় সংকুচিত হচ্ছে, এসব বিষয়ে কি নিয়মিত গবেষণা হচ্ছে? নাকি পরিবর্তনটি কর্মসংস্থানে বড় প্রভাব ফেলার পর আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাব?

তরুণদের কি একাই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে?

বর্তমান ব্যবস্থায় তরুণদের প্রায়ই বলা হয়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে হবে, নতুন দক্ষতা শিখতে হবে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। এ কথার যুক্তি আছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে শেখা বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ নেই।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী যখন কয়েক বছর ধরে একটি বিষয়ে পড়াশোনা করেন, তখন তিনি যে দক্ষতা অর্জনের জন্য সময় ও অর্থ ব্যয় করেন, সেই দক্ষতার চাহিদা যদি পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই বদলে যায়, তাহলে পুরো দায়িত্ব কি তাঁর একার?

একজন তরুণের পক্ষে ভবিষ্যতের সব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অনুমান করা সম্ভব নয়। কোন পেশায় কতটা কর্মসংস্থান থাকবে, কোন দক্ষতা কয়েক বছর পরও মূল্যবান হবে এবং কোন কাজ এআইয়ের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। 

সেই তথ্য দেওয়া, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ তৈরি করাও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ।

এখানে তরুণদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন শেখার সুযোগ, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, তথ্য এবং কর্মজগতে প্রবেশের বাস্তব পথ থাকে। সুযোগ সীমিত রেখে শুধু দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দিলে সমস্যার সমাধান হয় না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের প্রস্তুতি কতটা?

এআইয়ের যুগে শিক্ষার পরিবর্তন বলতে শুধু শ্রেণিকক্ষে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করাকে বোঝায় না। এর অর্থ হলো, কী শেখানো হবে, কীভাবে শেখানো হবে এবং শিক্ষার্থীর সক্ষমতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেসব বিষয়ও নতুন করে বিবেচনা করা।

যদি এআই কোনো শিক্ষার্থীর হয়ে তথ্য সংগ্রহ, উত্তর তৈরি কিংবা একটি প্রতিবেদন লিখে দিতে পারে, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল সেই প্রতিবেদন তৈরি করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি শিক্ষার্থী তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারছে কি না, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারছে কি না, ভুল শনাক্ত করতে পারছে কি না এবং নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে পারছে কি না, সেগুলোও মূল্যায়ন করা হবে?

এআইয়ের উত্তর সব সময় সঠিক নয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীকে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার শেখালেই হবে না, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে এবং দায়িত্বশীলভাবে তা ব্যবহার করতেও শেখাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। তাঁরা কি এআইয়ের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন? 

শিক্ষকদের কি নতুন পদ্ধতি শেখার সময়, উপকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা রয়েছে? শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়নপদ্ধতি কি পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উন্নত হচ্ছে?

এসব প্রশ্ন তোলা শিক্ষকদের ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ করার জন্য নয়। বরং শিক্ষকদের প্রস্তুত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সহায়তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নতুন যুগের উপযোগী দক্ষতা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত?

  • আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকেরা কতটা প্রস্তুত?

এআইয়ের পরিবর্তন শুধু শ্রেণিকক্ষ বা কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শ্রমিকের অধিকার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, বৈষম্য, মেধাস্বত্ব এবং কর্মসংস্থানের নীতির মতো বিষয়েও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এআই নিয়ে আলোচনা শুধু প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

বাংলাদেশের সংসদ সদস্য, আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি এআইয়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন? প্রযুক্তির পরিবর্তন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে, তা বুঝে কার্যকর আইন ও নীতি প্রণয়নের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?

আইনপ্রণেতা প্রত্যেক প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তাঁদের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রমাণভিত্তিক পরামর্শ নেওয়া, গবেষণার ফল বোঝা, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিগত আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে জাতীয় এআই নীতির একটি খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল। 

তবে নীতির খসড়া তৈরি এবং বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এক বিষয় নয়। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেগুলোর বাস্তবায়ন ও ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব কোন পর্যায়ে, আর বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

এখানে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ব যখন এআইয়ের যুগে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনা করছে, বাংলাদেশ কি সেই পরিবর্তনের গতি ও দিক যথাযথভাবে বুঝতে পারছে? 

দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কি জানেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ নিয়ে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে?

বিশ্বের অভিজ্ঞতা জানা মানেই অন্য দেশের ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করা নয়। বরং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষাব্যবস্থা ও জনশক্তির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করা। সে জন্য প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং পরিবর্তনের আগাম পূর্বাভাস।

এখানেই চাহিদা ও বাস্তবায়নের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগামী দিনে কোন খাতে কত ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হবে, তা কি নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হচ্ছে? 

সেই চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কি পরিবর্তিত হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া তরুণেরা বাস্তবে সেই দক্ষতা অর্জন করছেন কি না, এবং অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগানোর মতো কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা কি পরিমাপ করা হচ্ছে?

শুধু পরিকল্পনা তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থ, দক্ষ জনবল, সময়সীমা এবং সুস্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হয়। তারপর দেখতে হয়, প্রত্যাশিত ফল অর্জিত হচ্ছে কি না। 

যদি শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারেন, কিংবা দক্ষতা অর্জন করেও কাজ না পান, তাহলে সমস্যাটি কোথায়, তা অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা সংশোধন করতে হবে।

অর্থাৎ, শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। শিক্ষার সুযোগ কতটা বাড়ল, শুধু তা নয়; শিক্ষার মান কতটা উন্নত হলো, শিক্ষার্থীরা কী শিখল, সেই শেখা বাস্তবে কতটা কাজে লাগল এবং কতজন মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারল, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর থাকতে হবে।

এ দায়িত্ব কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একার নয়। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এই ব্যবধান দূর করা কঠিন। কিন্তু সমন্বয়ের দায়িত্ব কার, অগ্রগতি কীভাবে পরিমাপ করা হবে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কে ব্যবস্থা নেবে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

দেশ পরিচালনার সক্ষমতা শুধু বর্তমান সমস্যা মোকাবিলা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতের পরিবর্তন বুঝে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল যাচাই করাও সুশাসনের অংশ।

  • প্রযুক্তির অগ্রগতি, কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ কোথায়?

এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে প্রতিষ্ঠান কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণ এক বিষয় নয়। অর্থনীতি বড় হলেই যে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। 

অন্যদিকে, এই পরিবর্তনের ফলে যাঁরা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান, তাঁদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তির সুফল যেন শুধু কিছু প্রতিষ্ঠান বা দক্ষ কর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বৃহত্তর সমাজের কল্যাণেও কাজে লাগে, সেই লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশির (Internship) সুযোগ, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং কর্মক্ষেত্রে শেখার ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কর্মরত ব্যক্তিদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁদের কাজ করার সক্ষমতাও বাড়ে।

তবে শুধু প্রশিক্ষণ বাড়ালেই হবে না। অর্থনীতিতে নতুন কাজ সৃষ্টি, শিল্পের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণও জরুরি। কারণ, দক্ষতা থাকা আর সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত চাকরি থাকা এক বিষয় নয়।

  • আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই?

মানুষই এআই তৈরি করেছে। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্বের বিকাশও এগিয়ে নেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব। আমরা যদি প্রযুক্তিকে দ্রুত উন্নত করি, অথচ শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও নীতিনির্ধারণকে পুরোনো ধারণার মধ্যে আটকে রাখি, তাহলে প্রযুক্তির সক্ষমতা ও মানুষের সুযোগের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের তরুণেরা শুধু ভবিষ্যতের কর্মী নন। তাঁরা দেশের বর্তমান নাগরিক, সম্ভাব্য উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অংশ। তাঁদের শিক্ষা ও শ্রমের বিনিয়োগকে অর্থবহ করে তোলা, কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে শেখার পথ উন্মুক্ত রাখা জাতীয় উন্নয়নেরও অংশ।

আমাদের তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তব জীবনের জন্য মানুষ তৈরি করছে? শিক্ষকেরা কি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাচ্ছেন?

নিয়োগকর্তারা কি নতুনদের শেখার ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছেন? আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকেরা কি প্রযুক্তির পরিবর্তন বুঝে সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? আর এআইয়ের মাধ্যমে অর্জিত উৎপাদনশীলতার সুফল কীভাবে বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছাবে?

এআই কত দ্রুত কাজ করতে পারে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করতে পারছি। যে উন্নয়নে তরুণদের শিক্ষা ও শ্রমের মূল্য থাকবে না, কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়বে, সেই উন্নয়নের সাফল্য কীভাবে বিচার করা হবে?

প্রযুক্তির পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন হলো পরিবর্তনের জন্য আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া, সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝা এবং মানুষের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখা।

আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার মূল্য তরুণদেরই দিতে হবে?

লেখক : রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!