ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ মতামত ]
সংবাদ বিশ্লেষণ

সেলাই দিদিমণিরা কি এ কালের কৃতদাস?

দৈনিক খাদ্য ব্যয় গড়ে প্রায় ১০২ টাকা
মুকুল মোহাম্মদ
প্রকাশিত: ১২:২৫, ৩ নভেম্বর ২০২৬
সেলাই দিদিমণিরা কি এ কালের কৃতদাস?
কম মজুরির মাধ্যমে সাময়িকভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমায়, অসন্তোষ বাড়ায় এবং দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে
  • চার সদস্যের পরিবারের মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় ঢাকায় ৪৮ হাজার ২২ টাকা। দৈনিক খাদ্য ব্যয় গড়ে প্রায় ১০২ টাকা- যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যানকার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের গবেষণায়

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি আয় আসে কার শ্রমে? এই শ্রমিকদের শ্রমেই তো। যাদের ১৬ ঘণ্টা খাটুনির গল্প শুনিয়ে আমরা Made in Bangladesh নিয়ে গর্ব করি, তাদের বেতন বাড়ানোর কথা আসলেই এত সমস্যা কেন?

বিদেশি শ্রমবাজারের সঙ্গে তুলনা করলে শুধু বেতন তুলনা করবেন কেন? ওইসব দেশের জীবনযাত্রার খরচ, ক্রয়ক্ষমতা, শ্রমিকদের জীবনমানও তুলনা করেন। সব হিসাবের দায় কি শুধু শ্রমিকদের?

এই শহরে তোমার পাশে আমিও যে থাকি
  ও লাল টুক টুক সেলাই দিদিমনি
   দিদিমনি নিও তুমি আমার ভালবাসা
  তোমার চোখে দেখি আমি রঙ্গিন দিনের আশা
    লাল টুক টুক দিদিমনি...

মনে পড়ে এই ‘দিদিমণি’ গানের কথা? বলছি বাংলাদেশের জনপ্রিয় রক গায়ক জেমসের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্য অন্যতম গান ‘দিদিমণি’র কথা। যে গানের পুরোটাই জুড়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মুল চালিকা শক্তি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত লাখো শ্রমজীবী নারীর কথা। গানটি জেমস এই সকল নারী শ্রমিকদের উৎসর্গ করেই গেয়েছিলেন।

সেলাই দিদিমণি, তুমি কি এ কালের কৃতদাস।' কম খাবে, কম ঘুমাবে মাস শেষে সাড়ে ১২ হাজার ! একটু চিন্তা করেন, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের জীবনটা কেমন। মাস শেষে ১২,৫০০ টাকা বেতন। এই টাকা দিয়ে নিজের খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা, বাচ্চার স্কুলের খরচ, পরিবারের বাজার—সব চালাতে হয়।

বিবিএসের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, একটি পরিবারের গড় মাসিক খরচ গ্রামে ৩২,৫৩২ টাকা, শহরে ৩৭,৩৪৪ টাকা। এখন বলেন, ১২,৫০০ টাকায় একটা পরিবার চলে কেমনে?

একটা এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২,৫০০ টাকা। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজির দাম দেখেন। বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত সবকিছুর খরচ বাড়ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, তেলের দাম বাড়ছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যানকার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের গবেষণায়, চার সদস্যের একটি পরিবারের গড় উপার্জনক্ষম সদস্যের সংখ্যা ১ দশমিক ৫৮ ধরে ঢাকায় জীবনধারণযোগ্য মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। ঢাকার আশপাশের স্যাটেলাইট শহরগুলোতে এর পরিমাণ ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা।

গবেষণায় চার সদস্যের পরিবারের মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় ঢাকায় ৪৮ হাজার ২২ টাকা এবং আশপাশের স্যাটেলাইট শহরগুলোতে ৩৯ হাজার ৭৬২ টাকা ধরা হয়েছে।

গবেষণার হিসাবের সঙ্গে বর্তমান ন্যূনতম মজুরির তুলনা করলে দেখা যায়, ঢাকায় জীবনধারণযোগ্য মজুরি ও সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরির ব্যবধান ১৭ হাজার ৯৫৯ টাকা। আশপাশের স্যাটেলাইট শহরগুলোতে এ ব্যবধান ১২ হাজার ৬৬৬ টাকা।

অ্যানকার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় জীবনধারণের জন্য যে ন্যূনতম মাসিক মজুরির কথা উল্লেখ রয়েছে, সেই প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমেরিকানরা গবেষণায় এ কথা বলছে। অথচ আমরা দাম বাড়ালে আমেরিকান বায়াররাই তো থাকবে না। সুতরাং ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি বাস্তবসম্মত নয়।’

শ্রমিকদের পারিবারিক দায়িত্বের প্রসঙ্গে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট রেজওয়ান সেলিম বলেন, ‘১৮ বছর বয়সী সব শ্রমিকের শুরুতেই চার সদস্যের পরিবার থাকে না। অনেক শ্রমিককে হয়তো মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয়। তবে এই বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’

শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণে খাদ্য ও পুষ্টির ব্যয় দেখানো হয়েছে-
একজন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক ন্যূনতম ২ হাজার ১০০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তির প্রয়োজন হয়। এটি নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ব্যয় মাসে প্রায় ৩ হাজার ৫১ টাকা। 

অর্থাৎ দৈনিক খাদ্য ব্যয় গড়ে প্রায় ১০২ টাকা। এই হিসাবে চার সদস্যের একটি পরিবারের সবার জন্য একই পরিমাণ খাদ্যশক্তির খাবার কিনতে মাসে প্রয়োজন হবে ১২ হাজার ২০৪ টাকা। তবে এ হিসাবের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বয়স, কাজের ধরন ও ব্যক্তিভেদে পুষ্টির চাহিদার পার্থক্য বিবেচনার বাইরে থেকে যায়। তাছাড়া শুধু ক্যালরির চাহিদা পূরণ করলেই সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।

চলতি বছরের ২১ জুলাই প্রকাশিত জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষের দৈনিক ন্যূনতম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবারের খরচ ৪ ডলার ৫৯ সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৬৭ টাকা ৩২ পয়সা। সে হিসাবে চার সদস্যের একটি পরিবারের সবার জন্য পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবারের খরচ মাসে প্রায় ৬৮ হাজার ৭৮ টাকা।

খাদ্য ব্যয়ের এসব হিসাবের সঙ্গে বাসস্থান, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ যোগ করলে পরিবারের মোট জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ে।

এমন অবস্থা প্রেক্ষিতে এবারের আন্দোলনে শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় এই দাবি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির তুলনায় শ্রমিকরা ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন। ডলারের হিসাবে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি প্রায় ১০১ ডলার। 

অন্যদিকে ৩০ হাজার টাকা প্রায় ২৪২ ডলারের সমান। শ্রমিকদের যুক্তি, গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের আয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে সংসারের মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি গড়ে ১৪৫ ডলার, ভিয়েতনামে ১৭৫ ডলার, ভারতে ১৯২ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২১০ ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২২২ ডলার ও চীনে ৩৩৭ ডলার। তবে এ খাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ন্যূনতম মজুরি তুরস্কে ৬৬২ ডলার। এ অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরির পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দেশভিত্তিক মজুরির তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা যা ডলারের হিসাবে প্রায় ১০১ ডলার। এশিয়ার কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় এ মজুরি বেশ কম। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি শুধু শ্রীলঙ্কায়। দেশটির পোশাক খাতে শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৯০ ডলার। আর বাংলাদেশের কাছাকাছি মজুরি রয়েছে উজবেকিস্তানের। দেশটিতে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০৬ ডলার।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'কম মজুরি দিয়ে সাময়িকভাবে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও দেশীয় চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মজুরি বৃদ্ধিকে ব্যয় হিসেবে না দেখে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।'

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অনেক শ্রমিকের আয় দিয়ে এসব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাদের মধ্যে ঋণ, অপুষ্টি ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করা জরুরি। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, কম মজুরির মাধ্যমে সাময়িকভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমায়, অসন্তোষ বাড়ায় এবং দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে।

এতে দেশীয় চাহিদা ও শিল্পের প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মজুরি বৃদ্ধিকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শিল্পের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ১ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়।

ফলে প্রায় তিন বছর পর আবারও নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক ও শ্রীলঙ্কা ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও চীনে নিয়মিত অঞ্চলভিত্তিক মজুরি সমন্বয় হচ্ছে।

বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য চারটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-১-এর সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১৫ হাজার ৩৫ টাকা, গ্রেড-২-এর ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা, গ্রেড-৩-এর ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা এবং গ্রেড-৪-এর ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সর্বনিম্ন গ্রেডের ১২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা।

এছাড়া বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৪৫০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া শিক্ষানবিস শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের শিক্ষানবিসকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে তাদের মোট মাসিক মজুরি ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!