বয়স বাড়লে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দেয় মানতা রে
সমুদ্রের বিশাল আকৃতির সামুদ্রিক প্রাণী মানতা রের চলাচলের ধরন বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরিণত মানতা রে সাধারণত উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করে। অন্যদিকে, পূর্ণবয়স্ক মানতা রে খাবার ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশের সন্ধানে শত শত কিলোমিটার দূরে পাড়ি দেয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকার সমুদ্রসীমায় মানতা রের চলাচল নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অ্যাকুস্টিক ট্রান্সমিটার, স্যাটেলাইট ট্যাগ ও ছবি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণীগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এ সময় ৫৯টি মানতা রের শরীরে অ্যাকুস্টিক ট্রান্সমিটার বসানো হয় এবং ১২টির চলাচল স্যাটেলাইট ট্যাগের মাধ্যমে অনুসরণ করা হয়।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও গবেষণা দল মানটাস কোস্টারিকার পরিচালক জেফরি মাদ্রিগাল-মেসেন জানান, বিভিন্ন প্রযুক্তি থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে মানতা রের চলাচল এবং উপকূলের নির্দিষ্ট স্থানে বারবার ফিরে আসার প্রবণতা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া গেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিশ সায়েন্স সাময়িকীতে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ মিটার চওড়া অপরিণত মানতা রে সাধারণত কোস্টারিকার উপকূলীয় জলসীমার মধ্যেই থাকে। অন্যদিকে, প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ মিটার চওড়া পূর্ণবয়স্ক মানতা রে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে। কিছু প্রাণীকে গুয়াতেমালার সমুদ্রসীমার কাছাকাছি পর্যন্ত যেতে দেখা গেছে।
ছোট মানতা রে কেন দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রা এড়িয়ে চলে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, অর্কা ও টাইগার শার্কের মতো বড় শিকারি প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি তাদের চলাচল সীমিত রাখতে পারে।
মাদ্রিগাল-মেসেনের মতে, মানতা রের বিশাল দেহ আত্মরক্ষায় সহায়ক হলেও তা তাদের পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারে না। অনেক প্রাণীর শরীরে ক্ষত কিংবা শরীরের কোনো অংশ অনুপস্থিত দেখা গেছে। ক্ষতগুলোর আকৃতি থেকে কিছু ক্ষেত্রে বড় সামুদ্রিক শিকারির কামড়ের চিহ্ন বলে ধারণা করা হয়।
পূর্ণবয়স্ক মানতা রে কখন এবং কেন দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রা শুরু করে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়। গবেষকদের ধারণা, মধ্য আমেরিকার পুষ্টিসমৃদ্ধ জলসীমায় খাবার ও প্রজননের সুযোগ তাদের চলাচলে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় মানতা রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আচরণ উঠে এসেছে। প্রাণীগুলো উপকূলের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে বারবার ফিরে আসে। এসব স্থানে ছোট মাছ তাদের শরীর থেকে পরজীবী সরিয়ে দেয়। এ ধরনের স্থানকে বলা হয় ‘ক্লিনিং স্টেশন’।
গবেষকেরা এসব এলাকায় মানতা রের খাবার খাওয়া, প্রণয় আচরণ ও সাম্প্রতিক মিলনের লক্ষণও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ক্লিনিং স্টেশন শুধু শরীর পরিষ্কারের জায়গা নয়, বরং প্রাণীগুলোর সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রও হতে পারে। তবে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলাচলের পর কীভাবে তারা নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে আসে, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য।
কাছাকাছি দূরত্বে থাকা পর্যবেক্ষণস্থলগুলোর মধ্যেও মানতা রের চলাচল তুলনামূলক কম বলে গবেষণায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, প্রাণীগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় থাকতে পছন্দ করে। ‘মিকি মাউস’ নামে পরিচিত একটি পুরুষ মানতা রেকে কোস্টারিকার কাবো ব্লাঙ্কো এলাকায় বারবার দেখা গিয়েছিল। শরীরের স্বতন্ত্র দাগের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা হয়। তবে এক বছরের বেশি সময় ধরে তাকে সেখানে দেখা যায়নি।
মানতা রে ধীরে প্রজনন করে এবং যৌন পরিপক্বতায় পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় নেয়। ফলে শিকার ও পরিবেশগত হুমকির কারণে এদের সংখ্যা কমে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোকোস দ্বীপ ও অন্যান্য উপকূলীয় পর্যবেক্ষণস্থল ছেড়ে যাওয়ার পর মানতা রে এমন সমুদ্র এলাকায় প্রবেশ করে, যেখানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই। এসব এলাকায় মাছ ধরার কার্যক্রম ও জাহাজ চলাচল তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষকদের মতে, উপকূলীয় আশ্রয়স্থলগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময়েই মানতা রেকে সুরক্ষা দিতে পারে। তাই প্রাণীগুলোর চলাচলের সামুদ্রিক পথগুলোও সংরক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।
গবেষণার তথ্য আরও ইঙ্গিত দেয়, কোস্টারিকায় দেখা মানতা রেগুলো ইকুয়েডর বা মেক্সিকোর জলসীমা থেকে আসছে—এমন ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। মধ্য আমেরিকায় তাদের স্বতন্ত্র কোনো জনগোষ্ঠী রয়েছে কি না, তা জানতে গবেষকেরা বর্তমানে জিনগত বিশ্লেষণ করছেন।