ঝুঁকিতে লাখো পর্যটক, তদারকিতে চরম উদাসীনতা
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘টুপটুপ রেস্তোরা অ্যান্ড রিসোর্ট’। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক টুকরো স্বর্গরাজ্য—কাঠ, বাঁশ ও ছনের শৈল্পিক ছোঁয়ায় তৈরি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। পর্যটকদের ভিড়ও বছরজুড়ে লেগেই থাকে। কিন্তু অনিন্দ্য সুন্দর এই রিসোর্টটির ভেতরের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। আজ শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে এই রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে অন্তত ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রিসোর্টটি কোনো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চলছিল এবং ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সও ছিল না। গত জুনে পরিদর্শন করে ১১ জুন নোটিশ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া হয়। কাঠ ও বাঁশের তৈরি তিনতলা এই স্থাপনায় ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা—স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার এলার্ম, পর্যাপ্ত এক্সটিংগুইশার বা জরুরি বহির্গমন পথ—কিছুই ছিল না। নিকটতম ফায়ার স্টেশন থেকে দূরত্ব ছিল প্রায় ২২ কিলোমিটার।
এসময় সমুদ্রের তীব্র বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জনসহ বেশিরভাগই ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক। কেবল টুপটুপ রিসোর্টই নয়, বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির সাজেক, সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে গড়ে ওঠা হাজার হাজার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের বিশাল একটি অংশই এভাবে কোনো প্রকার অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে দ্রুত বিকাশমান এই খাতটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক জীবন বাজি রেখে চলছে। অথচ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও পর্যটন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি ও সমন্বিত তদারকির অভাবে অগ্নিকান্ডের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উখিয়ার ইনানী সৈকতের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এই রিসোর্টটি কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত। নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং উপরের তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। আজ সকালে রান্নাঘর থেকে আগুন লাগে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেছেন, তদের পরিদর্শক জুন মাসে ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করে নোটিশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে রিসোর্ট চালিয়ে গেছেন। সরাসরি বলতে গেলে, তারা অনুমতি ছাড়াই রিসোর্ট চালাচ্ছিল। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিসোর্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন দাবি করেছেন, স্টাফরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। চারজনের মরদেহ শৌচাগার থেকে উদ্ধার হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ঘটনার পর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন—প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং পর্যটকদের সহায়তায় প্রতিনিধি দল পাঠানোর। তিনি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটন খাতের সঙ্গে জরুরি বৈঠক এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুরও নির্দেশ দিয়েছেন।
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটন এলাকায় গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আগুন লেগে অন্তত ৩০ থেকে ৯৪টি রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করা হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। আগুন একটি রিসোর্ট থেকে শুরু হয়ে প্রবল বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নিকটতম ফায়ার স্টেশন দিঘিনালা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণা দেব বর্মণ বলেছিলেন, সবকিছু মুহূর্তে পুড়ে গেছে। পানি সংকটও আগুন নেভানোতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ স্থাপনাই কাঠ-বাঁশের তৈরি এবং কোনোটিরই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা ছিল না। জেলা প্রশাসন পর্যটকদের সাময়িকভাবে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করেছিল। পরবর্তীতে পুনর্র্নিমাণের অনুমোদন দেওয়া হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের গলাচিপা এলাকায় আগুন লেগে বিচ ভ্যালি ইকো রিসোর্ট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং কিংশুক ইকো রিসোর্ট ও শায়ারী ইকো রিসোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো হতাহতের খবর না থাকলেও একাধিক কাঠের কটেজ পুড়ে যায়। দ্বীপের বিচ্ছিন্ন অবস্থান ও সীমিত অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অনেক স্থাপনাই অনুমোদনহীন এবং অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছে।
চলতি বছরের মে মাসে কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের মধ্যে প্যাসিফিক বিচ লাউঞ্জ ইকো রিসোর্টে আগুন লেগে তিনটি কটেজ ও স্টোররুম পুড়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করা হয় ৬০-৭০ লাখ টাকা। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এ ঘটনায়ও দেখা গেছে কাঠের স্থাপনা ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারেই বছরে শত শত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং অনেক হোটেল-রিসোর্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
সাজেকে ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও একাধিক অগ্নিকান্ড ঘটেছে। ২০২৪ সালেও দুটি রিসোর্ট পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশজুড়ে পরিদর্শনকৃত ভবনের মধ্যে হাজার হাজার ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হয়েছে। রেস্তোরাঁ ও হোটেল ক্যাটাগরিতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডিজি সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেছেন, কক্সবাজারসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকায় কাঠের তৈরি অনেক রিসোর্ট অনুমোদন ছাড়াই চলছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নোটিশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপন আইন ২০০৩ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী যেকোনো বাণিজ্যিক আবাসন বা হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি বহির্গমন পথ এবং নির্দিষ্ট ক্ষমতার ওয়াটার রিজার্ভার রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। অনেক রিসোর্ট শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই চলে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও ট্যুরিজম বোর্ডের দায়িত্বশীলরাও স্বীকার করেছেন, নিরাপত্তা মানদন্ড মেনে চলার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠ-বাঁশের স্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ও জরুরি বহির্গমন পথ না থাকায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, শুধু লাইসেন্স নয়, নিয়মিত পরিদর্শন ও শাস্তির ব্যবস্থা জরুরি।
এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার মূল কারণ হলো নজরদারির অভাব, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ। অনেক রিসোর্ট মালিক দ্রুত মুনাফার জন্য নিরাপত্তা উপেক্ষা করেন। পর্যটকরাও সস্তা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের আকর্ষণে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় থাকতে রাজি হন। ফলে প্রতি বছরই নতুন নতুন ট্র্যাজেডি ঘটছে।