বরাবরের মতো দেশের ক্রিকেটে আনন্দ-বেদনা, হতাশা ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে কেটেছে এই বছর। শুরুটা যদি টেস্ট দিয়ে করতে হয়, খুব আশার কিছু নেই। চলতি বছর মাত্র ৭টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে হেরেছে ৫টিতেই। বাকি দুই ম্যাচে একটি করে ড্র ও জয় শুধু সান্ত্বনার প্রলেপ ছাড়া আর কিছু না।
চলতি বছর বাংলাদেশ একমাত্র ড্র করেছে এপ্রিলে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলেতে। জয় এসেছে দুর্বলতম প্রতিপক্ষে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। জুলাইয়ে হারারেতে ২২০ রানে জিতেছিল লাল সবুজরা।
.png)
পরিসংখ্যানটা অবশ্য আরো সমৃদ্ধই হতে পারতো। কিন্তু বছরের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট দুটো অবিশ্বাস্যভাবে জিততে জিততে হেরেছে মুমিনুল হকের দল। আশার প্রদীপ জ্বেলেও তা বারবার নিভিয়ে দিয়েছে টাইগাররা। আর হতাশায় পুড়েছে সমর্থকরা।
তাই বছর শেষে ৪৭ রেটিং নিয়ে র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। আটে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের থেকে ২৮ রেটিং কম টাইগারদের। এর থেকেও বড় বিষয় হচ্ছে- ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চক্র পয়েন্টহীনভাবে শেষ করার পর দ্বিতীয় চক্রেও পয়েন্টহীন থেকে বছর শেষ করতে হচ্ছে মুমিনুল হকের দলকে।
টেস্ট যদি হতাশার হয়, টি-২০ ফরম্যাটে রীতিমতো করুণ অবস্থা বাংলাদেশের। হয়তো খাতা কলমের হিসেবে লেখা থাকবে এ বছরই প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে সিরিজ হারিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সেটা যে কতটা ভালো হয়েছে তা বোঝা যায় এই দুই সিরিজের পরই হওয়া বিশ্বকাপের ফলাফলে।
অস্ট্রেলিয়ায় আগামী বছর হতে যাওয়া পরবর্তী বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণের টিকেট নিশ্চিত করলেও এই সংস্করণে বছরটা বাংলাদেশকে দশম স্থানে থেকে শেষ করতে হচ্ছে। বিশ্বকাপে ভুয়া আত্মবিশ্বাস নিয়ে যাওয়ার পর মূলপর্বে লজ্জার রেকর্ডগুলো পারলে ভুলে যেতে চাইবে টাইগাররা।
এ বছর ২৭ ম্যাচ খেলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল জয় পেয়েছে ১১টি। অতীতে নির্দিষ্ট কোনো বছরে এত জয় অবশ্য পায়নি বাংলাদেশ। ক্রিকেটের এই ক্ষুদ্র সংস্করণে এতগুলো ম্যাচও আগের কোনো বছরে খেলার সুযোগ হয়নি।
বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ওয়ানডেতে অবশ্য এ বছর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ খেলেছে টাইগাররা। এর মাঝে কেবল নিউজিল্যান্ডের কাছেই হেরেছে তারা। তামিম ইকবালের দল বিজয়কেতন উড়িয়েছে বাকি তিন সিরিজেই।
ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর জুলাইয়ে জিম্বাবুয়েকে করেছে ধবলধোলাই। সবমিলিয়ে ১২ ম্যাচ খেলে জিতেছে আটটি। তাতে ৮০ পয়েন্ট নিয়ে ২০২৩ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের নামে চলমান ওয়ানডে সুপার লিগ টেবিলে দুইয়ে রয়েছে টাইগাররা। র্যাংকিংয়ে আছে সাত নম্বরে।
ওয়ানডের মতো ব্যক্তিগত অর্জনেও উজ্জ্বল ছিলেন অনেক ক্রিকেটার। দারুণ পারফরম্যান্সে আইসিসির মে মাসের সেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম। পরে জুলাই মাসের সেরার খেতাব পান সাকিব আল হাসান।
এছাড়া এ বছরই টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ষষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে ২০০ উইকেট আর ৪ হাজার রানের ডাবলস পূর্ণ করেছেন সাকিব, পরেছেন আন্তর্জাতিক টি-২০তে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারীর মুকুট। তিনিই আবার এ বছর একাধিক বিতর্কিত কাণ্ড ঘটিয়ে হয়েছেন খবরের শিরোনাম।
ওয়ানডেতে এ বছর সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় সেরা পাঁচে জায়গা পেয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান (১৮ উইকেট নিয়ে চতুর্থ) ও সাকিব (১৭ উইকেট নিয়ে পঞ্চম)। ৬ টেস্টে ৩০ উইকেট নিয়ে এই সংস্করণে বছরের অষ্টম সফল বোলার তাইজুল ইসলাম।
এছাড়া ২০ ম্যাচে ২৮ উইকেট নিয়ে টি-২০তে পঞ্চম সেরা মুস্তাফিজ, ১৮ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে সাকিব নবম। ওয়ানডে ফরম্যাটে ব্যাটিংয়ে সেরা দশে আছেন তামিম ইকবাল (৪৬৪ রান নিয়ে তৃতীয়), মুশফিকুর রহিম (৪০৭ রান নিয়ে ষষ্ঠ) আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (৩৯৯ রান নিয়ে অষ্টম)।
৫৭৫ রান নিয়ে টি-২০তে নাইম শেখ আছেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে। তিন সংস্করণ মিলিয়ে এ বছর ১ হাজার ৫৮ রান করে বাংলাদেশের সফল ব্যাটসম্যান লিটন দাস। মাহমুদউল্লাহ (১০৪৫) আর মুশফিকও (১০৩৩) খুব একটা পিছিয়ে ছিলেন না।
ছেলেদের ক্রিকেটে হতাশার গল্প থাকলেও নারীদের ক্রিকেটের ছিল সুখবরের ছড়াছড়ি। এ বছরই মেয়েদের ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া ভারতে অনুষ্ঠিতব্য নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপেও প্রথমবারের মতো জায়গা নিশ্চিত করেছে বাংলার মেয়েরা।
এছাড়া নিয়ম মেনে চার বছর পর গত ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে বিসিবি নির্বাচন। সেই নির্বাচন অবশ্য দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। আগের দুবারের মতো এবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন নাজমুল হাসান।
যথারীতি পাপনের সমর্থন পাওয়া সংগঠকরাই নির্বাচিত হয়ে বিসিবির পরিচালক হয়েছেন। আগের মতো ছকে বাঁধা নীতিতেই চলছে বিসিবি, মাঠের ক্রিকেটে টিম বাংলাদেশও।
আগামী বছর বেশ কিছু বড় টুর্নামেন্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ। বর্তমানের হতশ্রী অবস্থা কাটিয়ে দারুন কিছু উপহার দেবেন টাইগাররা, এখন সে অপেক্ষাতেই সময় কাটাচ্ছেন সমর্থকরা।