বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে হারাতে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ১২ বলে ১৬ রান। এমন সময় টাইগার অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা বল তুলে দিলেন রুবেল হোসেনের হাতে। ওভারের প্রথম বলেই আউটসুইংয়ে ব্রডকে সাজঘরে ফেরান তিনি। আর ওভারের তৃতীয় বলে জেমস অ্যান্ডারসনকে ইয়র্কারে পরাস্ত করে এই পেসার রচনা করেন নতুন এক ইতিহাস।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আট বছর আগের আজকের দিনটা ছিল ঐতিহাসিক, অবিস্মরণীয়। এই দিন এলেই ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে বিশ্বকাপের সেই স্মৃতির ম্যাচটি। যেদিন বিশ্বমঞ্চে ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডকে কাঁদিয়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
.png)
সেদিন বিশ্ব দেখেছিল বিদেশের মাটিতে বাঘের গর্জন। যে গর্জনে কেঁপে উঠেছিল অ্যাডিলেইড ওভাল থেকে শুরু করে সমগ্র বাংলাদেশ। ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সেই ম্যাচ নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।
২০১৫ ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপের ৩৩তম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেইড ওভালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। শক্তিশালী ইংলিশদের বিপক্ষে বেশ সাদামাটা একাদশ নিয়েই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিল মাশরাফীর দল।
এদিন টস জিতে বাংলাদেশকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠায় ইংল্যান্ড। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই তামিম ও ইমরুলকে হারিয়ে বিপদে পড়ে টাইগাররা। তাদের দু’জনেরই সংগ্রহ ছিল মাত্র ২ রান। তবে ওয়ান ডাউনে নামা সৌম্য সরকার ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২২ গজে লড়াই শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যাটিং বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে শুরু করে টিম টাইগার্স।
বাংলাদেশের দলীয় রান যখন ১০০ পেরিয়েছে তখন জর্ডানের বলে উইকেটের পেছনে বাটলারের কাছে ক্যাচ দিয়ে ৪০ রানে সাজঘরে ফেরেন সৌম্য সরকার। অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মাহমুদউল্লাহ তখনও দলের হাল ধরে আছেন।
এ সময় ক্রিজে আসেন মুশফিকুর রহিম। টাইগারদের দুই সিনিয়র ক্যাম্পেইনার মিলে বাংলাদেশ দলকে শক্ত ভিত তৈরী করে দেয়। পঞ্চম উইকেটে দলকে ১৪১ রান এনে দেয় এই জুটি। এরপরই বিশ্ব মঞ্চে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে শতকের দেখা পান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
যদিও সেঞ্চুরির ইনিংস লম্বা করতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। ওকসের করা দ্রুতগতির থ্রোতে ১০৩ এ থামেন তিনি। ইংলিশ বোলারদের পিটিয়ে ব্যক্তিগত ৮৯ রানে ফেরেন মুশফিকও। শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৭৫ রান করেন বাংলার বাঘরা।
বিশ্বমঞ্চে ডু অর ডাই ম্যাচে ইংলিশদের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭৬ রান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করে মঈন আলী ও ইয়ান বেল। সপ্তম ওভারে সৌম্যর দুর্দান্ত থ্রোতে রান আউট হন মঈন আলী।
এরপর হেলস ও জো রুটকে সঙ্গী করে স্কোরকার্ডে রান যোগ করতে থাকেন বেল। ব্যক্তিগত ৬৩ রান করে সাজঘরে ফেরার আগে অর্ধশতক তুলে নেন এই ব্যাটার। টাইগারদের বোলিং তোপে সাজঘরে ফেরেন হেলস ও রুট। এদিন ইংনিস বড় করতে পারেননি ইংলিশ অধিনায়ক মরগ্যানও।
ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারদের ব্যর্থতার দিনে টাইগারদের মনে ভয় ধরিয়ে দেন জস বাটলার ও ক্রিস ওকস। দলের দুঃসমেয়ে এ দু’জনের ব্যাট থেকে আসে ১০৭ রান। ইংলিশরা যখন জয়ের খুব কাছাকাছি তখন ৪৫.৫ ওভারের বলে বাটলারকে মুশফিকের তালুবন্দী করেন তাসকিন।
মূলত এরপর থেকেই পিছিয়ে পড়তে শুরু করে থ্রি লায়ন্সরা। এরপর ইংল্যান্ডের বোলারদের নিয়ে জয়ের লক্ষ্যে এগোতে থাকেন ক্রিস ওকস। ইংলিশদের জয়ের জন্য যখন ১৫ বলে ২০ রান প্রয়োজন তখন তাসকিনের বলে লং অনে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন তিনি।
তবে ওকসের দেওয়া সেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে ম্যাচের খলনায়ক বনে যান তামিম। ধীরে ধীরে সমাপ্তির পথে এগোতে থাকা ম্যাচে ৪৮ ওভার শেষে ইংলিশদের রান তখন ২৬০। জয়ের জন্য প্রয়োজন ১২ বলে মাত্র ১৬ রান।
৪৯তম ওভারটি অধিনায়ক মাশরাফী কাকে দিয়ে করাবেন, তা নিয়ে মাঠে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা চলে। অবশেষে বল তুলে দেওয়া হয় রুবেল হোসেনের হাতে। ব্যাট হাতে তার সামনে তখন দাঁড়িয়ে ব্রড। আউটসুইংয়ে তাকে বোল্ড করেন রুবেল।
এরপর ক্রিজে আসেন জেমস অ্যান্ডারসন। ওভারের দ্বিতীয় বলটি ডট দিয়ে পরের বলেই ইয়র্কারে অ্যান্ডারসনকে পরাস্ত করে ইতিহাস লেখেন এ পেস বোলার। আনন্দের আতিশয্যে অ্যাডিলেইডের সবুজ গালিচায় ক্লান্ত শরীরকে আত্মসমর্পণ করেন অধিনায়ক মাশরাফী।
অন্যদিকে শেষ উইকেট শিকারের সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত শুন্যে ভাসিয়ে ভো দৌঁড় শুরু করেন রুবেল। তার পিছু নেন দলের বাকি সদস্যরাও। অবশেষে দৌঁড় থামিয়ে অধিনায়ক মাশরাফীকে নিয়ে সবাই উদযাপন শুরু করেন।
অ্যাডিলেইড ওভালে যখন মাশফারীরা ইতিহাস রচনা করে ফেলেছেন তখন হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশেও বইতে শুরু করেছে উৎসবের বন্যা। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলেছে ক্রিকেটারদের বন্দনা।
বিশ্বকাপের এই ম্যাচটি হয়তো কখনোই ভুলতে চাইবে না বাংলাদেশের আপামর ক্রিকেটপাগল ভক্তরা। কে জানে এই ম্যাচটিই হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এমন দিন বাংলাদেশ ক্রিকেটে বারংবার ফিরে আসুক, সেই প্রত্যাশাই সকলের।