মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে সহ বর্তমান সময়ের বেশ কিছু তারকা খেলোয়াড় নিয়ে গড়া পিএসজি স্কোয়াড। কিন্তু এরপরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না দলটি। যার সবশেষ উদাহরণ দেখা গেছে ৮ মার্চ, ২০২৩-এ।
বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মাটিতে বসে আছেন মেসি। মুলার হাত ধরে তাকে টেনে তুলছেন। ছবিটার মধ্যেই যেন ফুটে উঠছে মেসির অসহায়ত্ব। এই ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন বাভারিয়ান মিডফিল্ডার ও জার্মান খেলোয়াড় থমাস মুলার। সেই সঙ্গে জার্মান এই তারকা বলেছেন, ‘মেসির বিপক্ষে সবকিছুই আমাদের পক্ষে থাকে। এমনকি ম্যাচের ফলও।’
.png)
থমাস মুলারের এই কথা কিছুটা হলেও প্রসিদ্ধ। অতীত পরিসংখ্যান তো তাই বলে। বায়ার্নের বিপক্ষে মেসির রেকর্ড তুলনা করা যেতে পারে। মেসির ক্যারিয়ারে জার্মান ক্লাবটির বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ৯টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, হেরেছেন ৬টি। এছাড়া জিতেছেন দুটি। আর ড্র বলতে মোটে একটি। এর মধ্যে একটি হলো ২০২০ সালের ৮ গোলে হজম করার রেকর্ড।
তখন মেসি ছিলেন বার্সেলোনার ফরোয়ার্ড ও অধিনায়ক। সর্বশেষ পিএসজির হয়ে মাঠে নেমেও ভালো করতে পারেননি মেসি। এমনকি এই ক্লাবটির বিপক্ষে ঘরের মাটিতে হেরেছিল পিএসজি। ফিরতি পর্বে বার্য়ানের মাঠ খেকে হেরে ইউরোপের বড় মঞ্চ থেকে নিয়েছে ফরাসি জায়ান্টরা।
এই হারের পর মেসিকে খোঁচা দিতে ভুলেননি মুলার। তিনি বলেন, ‘মেসির তুলনায় বরং রোনালদো আমাদের (বায়ার্নের) সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। সে যখন রিয়াল মাদ্রিদে খেলত, তখন তাকে নিয়ে আমরা বেশি চিন্তিত থাকতাম।’
পর্তুগিজ তারকার রেকর্ডও কিন্তু মুলারের কথার সঙ্গে মিলে যায়। বায়ার্নের বিপক্ষে ৮বার দেখা হয়েছে রোনালদোর। যেখানে ৫বার জিতেছেন সিআর সেভেন। ড্র হয়েছে ১টি ম্যাচ, হেরেছেন দুটিতে।
বার্য়ানের বিপক্ষে পিএসজির প্রথম লেগের ম্যাচে ছিলেন না নেইমার জুনিয়র। কাতার বিশ্বকাপে অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়েছিলেন তিনি। এরপর গত ২০ ফেব্রুয়ারি অ্যাঙ্কেলেই চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যান এ ব্রাজিল তারকা। ফলে প্রথম লেগের পাশাপাশি দ্বিতীয় লেগেও তাকে দেখা যায়নি।
চোটের কারণে বাকি মৌসুমও খেলতে পারবে না নেইমার। কাতার বিশ্বকাপে ভালো ফর্মেও ছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর লিগে ৮ ম্যাচে মাত্র ২ গোল করে সমালোচনার শিকার হন এই ফরোয়ার্ড। এই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি করেছেন ১৮ গোল।
মেসি ও নেইমারের বাইরে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম তারকা খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পে রয়েছে পিএসজিতে। সবশেষ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা বর্তমান সময়ের দুই জনপ্রিয় খেলোয়াড় দলে থাকতেও বার্য়ানের বিপক্ষে কোনো গোল করতে পারেনি পিএসজি, বিশ্বাস হয়?
শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের পর পিএসজির খেলোয়াড়দের নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শোনা যাচ্ছে নানা কথা। পিএসজির খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত খেলা খেলেন, দলের হয়ে খেলেন না এমন মন্তব্য করছেন কেউ কেউ। তবে আসলেই কি তাই?
তাহলে একটু পেছনে যেতে হবে। ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনা থেকে নেইমারকে কিনে নিয়েছিল ফরাসি ক্লাব পিএসজি। মূলত লক্ষ্য ছিল একটাই, ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরা। কিন্তু এখনো সেটি পরতে পারেনি ক্লাবটি। উল্টো দলের আরেক সতীর্থ এমবাপ্পের সঙ্গে নেইমারের সম্পর্ক ভালো নয়। পেনাল্টি নেয়া থেকে শুরু করে দলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সব কিছু মিলে নেইমারের সঙ্গে এমবাপ্পের সর্ম্পক ভালো নয়।
ফরাসি গণমাধ্যম লে’কিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘নেইমার তার পর্তুগিজ সতীর্থ ভিতিনিয়াকে নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। কারণ, ভিতিনিয়া নাকি বল ঠিকঠাক ধরতে পারছিলেন না, জায়গায় যেতে পারছিলেন না। আরেক ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড হুগো একিতিকের খেলা নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন নেইমার। ম্যাচের পর ক্লাবের ক্রীড়া উপদেষ্টা লুইস ক্যাম্পোসের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে দুই ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার ও মার্কুইনোসের।’
মূলত চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গেলেই ওলটপালট হয়ে যায় পিএসজি। ঘরোয়া অন্যান্য কাপও হরহামেশাই জেতে লা পারিসিয়ানরা। ইউরোপের এলিটের খাতায় নাম লেখাতে যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার বিকল্প নেই। সেখানে গিয়েই দলটি আর পারে না। বর্তমান মৌসুম সহ এখন পর্যন্ত মোট ১৫ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলেছে দলটি। যার মধ্যে শুধুমাত্র একবার রানার্স আপ হয়েছিল ফরাসি ক্লাবটি।
২০১৯-২০ মৌসুমের ফাইনাল প্রথমবারের মতো পিএসজিকে ইউরোপের সেরা হওয়ার হাতছানি দিচ্ছিল। তবে জার্মান ক্লাব বায়ার্নের কাছে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। এরপর দুনিয়ার সেরা তারকাদের দিয়ে দল সাজিয়েছিল পিএসজি। লক্ষ্য একটাই, ইউসিএল শিরোপাটা ছুঁতে চাওয়া। কিন্তু আরো একবার ব্যর্থ পিএসজি। এবার বিদায় শেষ ষোলো থেকে।
ইউরোপের ক্লাবগুলোতে এমনিতেই তারকাদের ছড়াছড়ি। তবে অন্য ক্লাবগুলোর তুলনায় রীতিমতো তারকাদের হাট বলা যায় ফরাসি ক্লাব পিএসজিকে। কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়ার পর এই হাট ক্রমশ বড় হয়েছে। একে একে বিশ্বের নামী-দামি ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়েছে পিএসজি। লক্ষ্য একটাই- ইউরোপ সেরার প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জিততে চায় দলটি। তবে বস্তা বস্তা পেট্রোডলার খরচ করে নানা ক্লাব থেকে তারকাদের দলে ভিড়িয়েও এখনো অধরা সেই ট্রফির স্বাদ পায়নি প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন।
পাবেই বা কেন। দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়রা নিজের মতো করে খেলে। ফুটবল তো একার খেলা নয়। দলের খেলা। যে দলটি পেনাল্টি শ্যুটার নির্ধারণ করে দেয় কোচ, সেখানে আর ভালো কি হতে পারে?
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, দশে মিলে করি কাজ/ হারি-জিতি নাহি লাজ। এ কথা তো সত্যি যে একার ওপরে আনন্দ, দুঃখ, অপমানের যে ভার জন্মায় একত্রিত হলে তা ভাগ হয়। এসবের নীতিগত গল্প, তথ্য আমরা জানি। সবাই যদি দলের হয়ে খেলতে তাহলে অবশ্যই তারকা বহুল দলটি সেরা হওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে পিএসজির বিদায়ে দলটির ফুটবলাররা দুঃখী হলেও খুশি হয়েছেন অনেকে। এই তালিকায় আছেন জিমি ক্যারাঘার। পিএসজির বিদায়ে খুশি হয়েছেন তিনি। লিভারপুল কিংবদন্তি এমনও বলেছেন, পিএসজি কোনো দল নয়, একটা গোলমাল। সিবিএস স্পোর্টসকে লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার বলেছেন, ‘পিএসজির বিদায়ে আমি খুশি হয়েছি। পুরো সেটআপ পছন্দ করি না। এটা দল নয়, একটা গোলমাল।’
পিএসজির পেট্রোডলার খরচ নিয়েও মন্তব্য করেছেন ক্যারাঘার। তিনি বলেছেন, ‘শেষ সাতবারের মধ্যে পাঁচবারই শেষ ষোলোয় বিদায় নিয়েছে তারা। অথচ তারা অন্যদের থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। তাদের বিশ্বসেরা ফুটবলারও রয়েছে।’
বিশ্বসেরা ফুটবলার থাকলেই যে সাফল্য আসবে, এমনটি মানতে নারাজ ক্যারাঘার। প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে পিএসজির ছিটকে যাওয়াকে সামনে এনেছেন তিনি। তার মতে, দলের ভারসাম্য অনুযায়ী ফুটবলার না কিনে বড় নামের ফুটবলারদের পেছনে অর্থ ব্যয়ে তাদের সাফল্য আসছে না। তিনি বলেছেন, ‘এই বিদায় আপনাকে প্রমাণ করে যে দল হয়ে খেলাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবলে এর গুরুত্ব আরো বেশি।’