ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

গ্রামীণ পর্যটন নিয়ে ভাবতে হবে

শাকিবুল হাসান
প্রকাশিত: ১৩:০১, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্রামীণ পর্যটন নিয়ে ভাবতে হবে
যেহেতু বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, সেজন্য পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর জন্য গ্রামের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে

মানুষ স্বভাবতই ঘুরতে পছন্দ করে। সেটা হতে পারে নিজ দেশের বিভিন্ন জায়গা অথবা বিশ্বের অন্যান্য দেশ। এই ঘোরার নেশাই বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অপার সম্ভবনা তৈরি করেছে। একটি দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় কয়েকটি খাতের ওপর। অন্যান্য খাতগুলোর সঙ্গে পর্যটন খাতও এখন সম্ভবনাময় হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে আজকের মরিশাসের কথাই ধরা যাক। 

আশির দশকে টেক্সটাইল খাতে তাদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন তার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়ে পরিকল্পনামাফিক দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সেই অর্থব্যয় করে আশ্চর্যজনকভাবে দশ বছরের মধ্যে একটি ধনী, উন্নত ও আধুনিক সংস্কৃতির দেশে পরিণত হলো। 

  • মরিশাস টেক্সটাইল দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুরু করলেও আজকের আধুনিক ও উন্নত মরিশাসকে বিশ্ববাসী চেনে বিশ্বখ্যাত পর্যটন গন্তব্য হিসেবে। পর্যটনশিল্পের ধারাবাহিক উন্নতি মরিশাসের অন্যান্য শিল্পের উন্নয়নে প্রভাব রেখেছে। 

এখন দেশটির মোট জনসংখ্যার দুই-পঞ্চমাংশ পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত। পর্যটন শিল্পের তাৎপর্যতা রক্ষার ক্ষেত্রেই প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

Advertisement

১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে এটি পালন হয়ে আসছে। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে সেতুবন্ধ গড়ে তোলা। এছাড়াও, পর্যটনের ভ‚মিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য।

No photo description available.

Pic : Zahidur Rahman Uzzal Talukder, সৌজন্য: গ্রাম পর্যটন Village Tourism
 

বাংলাদেশ পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ পর্যটন পণ্য। দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ যে ধারায় এগিয়েছে, তা খুব একটা আশাপ্রদ না হলেও বর্তমান আমলে এ শিল্পের বিকাশে সরকারের তৎপরতা ও প্রচেষ্টা আমাদের আলোর মুখ দেখাচ্ছে। 

২০১৮-১৯ সালের জরিপ মতে জিডিপিতে দেশের পর্যটন খাতের অবদান ছিল ৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। মোট কর্মসংস্থানের ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশের সুযোগ তৈরি করছে এই খাত। ২০১৯ সালে ৫ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ভ্রমণে গিয়েছেন ১৩ লাখ পর্যটক। 

দেশের মধ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন ২০ লাখেরও বেশি পর্যটক। দেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ জনবল। পরোক্ষভাবে ২৩ লাখ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ জনবলের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। 

  • পর্যটনশিল্প সার্ভিস ওরিয়েন্টেড বিধায় এ শিল্পে বিনিয়োগের হার যেমন কম, তেমনই লাভের হার অনেক বেশি। সেই হিসেবে ব্যবসা চলমান থাকলে লোকসানের ঝুঁকি যৎসামান্য। দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় সেক্টরের মতো পর্যটন শিল্প নিয়েও তার পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। 

পর্যটন শিল্পের জিডিপিতে প্রত্যক্ষ অবদানের ভিত্তিতে ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অবস্থান ১৪২তম। এই সমীকরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এর প্রধান কারণ বা বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাইরে পর্যটন উপযোগী উল্লেখযোগ্য ও উপযোগী উপাদানের অভাব। 

এই খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা। যোগাযোগের নিরাপদ ও উপযুক্ত মান পর্যটন শিল্পের ভিত্তি। বরাদ্দ যা-ও বা হয় সেটুকুও দেখা যায় সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না। এছাড়া পর্যটন খাতে নিযুক্ত জনবলের মানসিকতা, পর্যাপ্ত জ্ঞান ও পেশাদারিত্বের অভাব।

 সেই সঙ্গে পর্যটন বিষয়ক সঠিক, উপযুক্ত শিক্ষিত ও মননের মানুষের অপর্যাপ্ততা, প্রান্তিক পর্যায়ে ট্যুরিজম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ব্যক্তি পর্যায়ে প্রদত্ত সেবা, পণ্যের মাত্রাতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রবণতা, হয়রানিমূলক আচরণ ইত্যাদি আমাদের পর্যটন শিল্পের উন্নতির পথে বড় পিছুটান। 

জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণীয় এলাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। দেশের প্রান্তিক মানুষকে পর্যটন শিল্পে আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করার জন্য বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যটন ও কমিউনিটি বেজড পর্যটন উন্নয়নে কাজ করতে হবে। 

কেননা দেশের অধিকাংশ মানুষই গ্রামে বসবাস করে। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের এই সুযোগ জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তা জিডিপিতে পর্যটন শিল্পকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। এ দেশের প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অপার সৌন্দর্যের সমাহার।

No photo description available.

Pic : গ্রামে ঘুরি, সৌজন্য: গ্রাম পর্যটন Village Tourism
 

আমাদের দেশের গ্রামগুলো ছবির মতো সাজানো আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর অতিথিপরায়ণতা গ্রামীণ সৌন্দর্যকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্ধকার রাতে জোনাকি পোকার শরীরের আলো গ্রামগুলোকে করে তোলে চোখ ঝাঁজালো। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮৭ হাজারের বেশি গ্রাম রয়েছে। 

এই গ্রামগুলোকেই একেকটা পর্যটন স্থান বানানো যেতে পারে। এজন্য ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন ক্রাইসিসগুলো দূর করতে হবে। গ্রামই হতে পারে পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন পদ্ধতি, উদ্ভিদ, বিভিন্ন পাখি, নদী, হাওর, বিল, ঝিল, বিভিন্ন ধরনের লোকজ অনুষ্ঠান, গ্রামীণ পেশা, খেলাধুলা, প্রাচীন বৃক্ষ এসবই হবে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। 

  • আমাদের জাতিগত ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করে বিদেশি পর্যটন আকর্ষণ করা সম্ভব। বিদেশি পর্যটকরা গ্রামে যায় গ্রামীণ সৌন্দর্য অবলোকন করতে, সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে জানতে।

তারা আমাদের সঙ্গে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার খাবে, কৃষকদের ফসল রোপণ করা দেখবে, পুকুর থেকে মাছ ধরবে, পাকা ফল গাছ থেকে পেড়ে খাবে এবং যেসব এলাকায় মাটির ঘরবাড়ি সেখানে মাটির ঘরবাড়িতে তারা রাতে ঘুমাবে। এগুলো হবে তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। কারণ পর্যটকরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যায় অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে। 

এক্ষেত্রে আমাদের ‘একটি গ্রাম একটি পর্যটন স্থান’ শ্লোগান হিসেবে নেয়া যেতে পারে। গ্রামাঞ্চলে বিনোদন সেবা প্রদানে পর্যটন উন্নয়ন করার জন্য স্থানীয় সরকারকেও সুপরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। এসব গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্রে শহরের পর্যটকরাও বেড়াতে যাবে, যাতে গ্রাম এলাকায় আর্থিক কর্মকান্ডহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। 

এজন্য প্রয়োজন প্রতিটি গ্রামে বিনোদন পার্ক, শিশুপার্ক ও ঐতিহ্যবাহী স্পোর্টস আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত মাঠ। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হবে। এজন্য আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলোকে নান্দনিক উপায়ে তুলে ধরতে হবে। কৃষি প্রধান আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরতে হবে।

এখানে দেশের মিডিয়ার বড় একটি ভ‚মিকা রয়েছে। সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে পর্যটকদের আগমন ঘটছে। ইতিহাসখ্যাত পর্যটক ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা পর্যটক হিসেবেই এই বঙ্গদেশে এসেছিলেন। 

সুতরাং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে আয়তনে ছোট্ট এই দেশকে পর্যটন শিল্পের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব। এখানে শুধু প্রয়োজন একটি সুস্থির পরিবেশ তৈরি করা। পর্যটনশিল্পের প্রভ‚ত উন্নয়নে এ বিষয়গুলো নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপর। 

  • দেশের অর্থনীতিতে পর্যটনশিল্পের সুফল অনেকাংশেই নির্ভর করে এ সুস্থির পরিবেশের ওপর। এরপর আসে এ শিল্পকে সহজলভ্য ও সহজবোধ্য করার মাধ্যমে পৃথিবীর পর্যটকদের জানান দেয়া যে, বাংলাদেশ পর্যটকদের জন্য এক নৈসর্গিক ও আরামদায়ক গন্তব্য।

বাংলাদেশকে পর্যটকদের গন্তব্য হিসাবে আকৃষ্ট করাতে তাদের ভ্রমণ ব্যয় সংকোচন করার পাশাপাশি আবাসনের ক্ষেত্রে তাদের চাহিদার কথাটা মাথায় রাখা এবং তাদের সময়টাকে যতটা সম্ভব আরামদায়ক করা। পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আনা যায় সে বিষয়েও জোর দিতে হবে। 

No photo description available.

Pic : দেলোয়ার জাহান, প্রাকৃতিক কৃষি, সৌজন্য: গ্রাম পর্যটন Village Tourism
 

কেননা আমাদের এই ছোট অর্থনীতি দিয়ে পর্যটন খাতকে ঢেলে সাজাতে কয়েক বছর বা কয়েক যুগও লেগে যেতে পারে। আমাদের অর্থনীতিতে এই অপার সম্ভবনার বিষয়টি শিক্ষায় মাধ্যমিক পর্যায়েই অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যেন আমরা আরো গোড়া থেকে এ বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা রাখা সম্ভব হয়। 

অজ্ঞতাও পর্যটন খাতের উন্নতির পথে অনেক বড় একটা খাদ। আর এই খাদ রেখে সরকারের পক্ষে পর্যটনে সাফল্য বয়ে আনা অনেকাংশে অসম্ভব। সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ হতে পারে পৃথিবীব্যাপী সব মানুষের মনোযোগের আকর্ষণ। বারো মাসে তেরো পার্বণের এ দেশে প্রাচীনকাল থেকে যে জাতিগত উৎসবমুখরতা রয়েছে তার পরিচয় তৈরি করতে হবে পৃথিবীব্যাপী।

No photo description available.

সৌজন্য: গ্রাম পর্যটন Village Tourism

বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবের মাধ্যমে আমাদের পর্যটনশিল্পকে একটি বিশেষায়িত রূপ দিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, সেজন্য পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর জন্য গ্রামের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। 

এ শিল্পের উন্নয়নে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে, যা বাস্তবায়ন করতে দরকার সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। তাহলেই বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প হবে একটি রোল মডেল।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 
দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলামিস্ট ফোরাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। 

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!