জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতির ফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছে
পৃথিবীতে যখন মানুষ ক্ষুধার্ত, গৃহহীন, চিকিৎসাহীন ও নিরাপত্তাহীন, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থের একটি অংশ এমন একটি বিশাল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্যয় হচ্ছে, যার ঘোষিত লক্ষ্যই হলো শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও মানুষের উন্নয়ন। তাহলে সেই ব্যয়ের ফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে?
প্রতি বছর বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একত্রিত হন। সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে। ২০২৬ সালের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহেও প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।
এই বিশাল আয়োজনের পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও বিশাল প্রতিনিধিদল দূরদূরান্ত থেকে আসেন, থাকেন, খান এবং বৈঠক করেন। অথচ একই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এখনও ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বাসস্থানের অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও যুদ্ধের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
.png)
তাই প্রশ্নটি অশোভন নয়, বরং জরুরি:
এত বড় একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান যদি পৃথিবীর মানুষের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়, উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে তার সক্ষমতা কতটা? জনগণের অর্থে পরিচালিত এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কি মানুষের জীবনে আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত নয়?
একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমি এই প্রশ্ন তুলতেই পারি।
এটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্নটি আরও মৌলিক: জাতিসংঘ কেন প্রয়োজন, তার কাছ থেকে আমরা কী আশা করি, এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য বর্তমান কাঠামো কি যথেষ্ট?
জাতিসংঘ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু আট দশক পর পৃথিবী বদলে গেছে। জাতিসংঘ নিজেও স্বীকার করছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বর্তমান বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে এবং একে আজ ও আগামী দিনের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
তাহলে সমস্যাটি কোথায়?
একটি বড় প্রশ্ন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো নিয়ে। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের একটি বিশ্বে সাধারণ পরিষদের প্রতিটি সদস্যের একটি করে ভোট থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে ১৫টি সদস্যপদ, যার মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যেকোনো একটির নেতিবাচক ভোট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে দিতে পারে। অর্থাৎ ১৯৩টি রাষ্ট্রের সমান ভোটের সাধারণ পরিষদ এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একই কাঠামোগত ক্ষমতা বহন করে না। (জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, Voting System)
অন্যদিকে আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি ও আলোচনা চলছে। জাতিসংঘের বর্তমান সংস্কার আলোচনাতেও নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজন স্বীকার করা হয়েছে।
কিন্তু শুধু কয়েকটি নতুন আসন যোগ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
আজ অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নয়। কিন্তু আগামীকাল যে হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? আজ যে দেশ বা অঞ্চলকে আমরা যে গুরুত্বে দেখছি, কয়েক দশক পরও তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা জনমিতিক অবস্থান একই থাকবে, সেটাই বা কে নিশ্চিত করতে পারে?
তাহলে স্থায়ী সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোই কি একমাত্র সমাধান, নাকি এমন একটি কাঠামো দরকার যা পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকেও নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও সংশোধন করতে পারে?
এখানেই আসে Right First Time-এর ধারণা। অর্থাৎ শুধু আজকের সমস্যার সমাধান নয়, এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যার মধ্যে ভবিষ্যতের পরিবর্তন আগে থেকেই বিবেচনায় নেওয়ার এবং প্রয়োজন হলে নিজেকে সংশোধন করার ক্ষমতা থাকবে।
জাতিসংঘের Pact for the Future-এও বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও মানুষের কাছে জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজন স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠ জোরদার করা এবং আজ ও আগামী দিনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রের আসন দিয়ে শেষ হয় না।
যে সিদ্ধান্ত আজ নেওয়া হচ্ছে, তার প্রভাব পড়বে এমন মানুষদের ওপর যারা এখনও জন্মগ্রহণই করেনি। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য এবং নতুন ধরনের সংকট আগামী দিনের পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর মধ্যে কীভাবে কার্যকরভাবে আনা যায়, সেটিও ভাবতে হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন।
একটি ঘোষণা, একটি প্রস্তাব বা একটি সম্মেলন নিজে থেকে পৃথিবীর মানুষের জীবন বদলে দেয় না। বাস্তব ফলের জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার লক্ষ্য, সময়সীমা, অর্থের উৎস, দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ এবং জবাবদিহি। জনগণকে জানার সুযোগ থাকা উচিত, কোন বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় ব্যর্থতা ঘটেছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। পৃথিবীর কোনো মানুষ যদি ক্ষুধার্ত থাকে, চিকিৎসার অভাবে থাকে, নিরাপদ বাসস্থান না পায় কিংবা যুদ্ধ ও সহিংসতার ভয়ে দিন কাটায়, তাহলে শুধু আরেকটি সম্মেলন, আরেকটি ঘোষণা বা আরেকটি প্রতিশ্রুতি কি যথেষ্ট? জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কি আরও বেশি বাস্তব ফল দাবি করা উচিত নয়?
তাই প্রশ্নটি শুধু জাতিসংঘের সমালোচনা করার জন্য নয়। প্রশ্নটি হলো: আমরা কি এমন একটি জাতিসংঘ তৈরি করতে পারি, যেখানে প্রতিনিধিত্ব হবে পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সিদ্ধান্ত হবে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হবে পরিমাপযোগ্য এবং ব্যর্থতার জবাবদিহিও থাকবে?
সমাধান যুদ্ধ নয়। সমাধান কোনো রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া নয়। সমাধান হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, ধাপে ধাপে এবং প্রমাণভিত্তিক সংস্কার প্রক্রিয়া।
কারণ জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা শুধু এই কারণে নয় যে এটি বহু রাষ্ট্রকে একই টেবিলে বসায়। তার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে সেই টেবিল থেকে পৃথিবীর মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসে তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই খুব সরল:
যদি পৃথিবীর মানুষের অর্থে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির ফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, তার হিসাব কি সেই মানুষদের কাছে দেওয়া উচিত নয়?
আর যদি বর্তমান কাঠামো সেই কাজ যথেষ্ট কার্যকরভাবে করতে না পারে, তাহলে প্রশ্নটি জাতিসংঘ থাকবে কি থাকবে না, শুধু সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো, আগামী পৃথিবীর জন্য আমরা কেমন জাতিসংঘ চাই?
লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: [email protected]