ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

মরিয়মরা কেন বারে বারে হেরে যায়

দীপু মাহমুদ
প্রকাশিত: ১৮:৪৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মরিয়মরা কেন বারে বারে হেরে যায়
মরিয়ম হয়তো আর রুখে দাঁড়াতে পারবেন না। তার কণ্ঠ আর কোনোদিন শুনতে পাব না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমরা যদি শুধু বলি, ‘তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন?’- তাহলে প্রশ্নটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রশ্ন হওয়া উচিত- একজন ১৯ বছরের তরুণী যখন বলেছিলেন তিনি কষ্টে আছেন, তখন তাকে

মরিয়মের বয়স ১৯ বছর। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে গত জুন মাসে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর ঢাকার ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন তিনি। ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সেই বাসা থেকেই মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 

মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মরিয়মের কক্ষ থেকে হাতে লেখা কিছু চিরকুটও উদ্ধার হয়েছে। 

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো এবং তিনি পরিবারের সদস্যদের ফোন করে এসব কথা জানিয়েছিলেন। মরিয়মের বাবার অভিযোগ, এই নির্যাতন ও প্ররোচনার কারণেই মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন। 

Advertisement

পুলিশ গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ঘটনাটি তদন্ত করছে। তবে এগুলো এখনো অভিযোগ, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে আসলে কী ঘটেছিল এবং কার দায় কতটুকু। 

কিন্তু মরিয়মের মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে হবে- যে প্রশ্নটি শুধু এই একটি মৃত্যুর নয়, অসংখ্য নির্যাতিত নারীর। 

মরিয়ম আত্মহত্যা না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতেন কিনা? 
হ্যাঁ, তিনি রুখে দাঁড়াতে পারলে হয়তো তার প্রতিবাদ অন্যদের সাহস দিত। হয়তো তার বেরিয়ে আসা আরও কয়েকজন নারীকে বুঝিয়ে দিত- নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থাকা ছাড়া অন্য পথও আছে। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন নির্যাতিত মানুষকে দাঁড়াতে না পারার জন্য দায়ী করা কি আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ? 

বরং প্রশ্নটি অন্যভাবে করা দরকার- তিনি যখন ভেঙে পড়ছিলেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ কোথায় ছিল? 

মরিয়মের পরিবার বলছে, তিনি নির্যাতনের কথা তাদের জানিয়েছিলেন। যদি তাই সত্য হয়, তাহলে মরিয়মের কষ্টের খবর পরিবার জানত। কিন্তু খবর জানা আর একজন মানুষকে নিরাপদে নির্যাতনের পরিবেশ থেকে বের করে আনা এক বিষয় নয়। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে একজন তরুণী যখন স্বামীর সংসারে নির্যাতনের শিকার হন, তখন তাকে প্রায়ই বলা হয়- সহ্য করো, মানিয়ে নাও, সংসার টিকিয়ে রাখো। কখনো বলা হয়, সম্পর্কের ভেতরের বিষয় বাইরে নেওয়া ঠিক নয়। কখনো সামাজিক মর্যাদা, কখনো পরিবারের সম্মান, কখনো ভবিষ্যতের ভয় একজন নারীকে আরও গভীরে আটকে রাখে। 

এখানেই মরিয়মের মৃত্যু আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা শুধু শারীরিক আঘাতের বিষয় নয়; এর মধ্যে মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও পড়ে। বিশ্বজুড়ে প্রায় তিনজন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা অন্য কারও শারীরিক কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত বা সম্পর্কে থাকা কিশোরীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি- প্রতি পাঁচজনের বেশি ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। 

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, সহিংসতার প্রভাব শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে শেষ হয় না। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস, ঘুমের সমস্যা এবং আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ঝুঁকিও সম্পর্কিত। অর্থাৎ একজন মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ধরে ভয়, অপমান, নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতনের মধ্যে থাকেন, তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবোধও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

তাই ‘সে কেন চলে গেল না’, ‘কেন প্রতিবাদ করল না’, ‘কেন আত্মহত্যা করল’- এই প্রশ্নগুলো করার আগে আমাদের জিজ্ঞাসা করা দরকার, নিরাপদে চলে যাওয়ার পথটি কি আমরা তার সামনে খুলে রেখেছিলাম?

বাংলাদেশের আইনও বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সংসার-সংকট হিসেবে দেখেনি। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এ শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক, যৌন ও আর্থিক ক্ষতিকেও পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনটিতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পাশাপাশি তার পক্ষে অন্য ব্যক্তি, সেবা প্রদানকারী বা প্রয়োগকারী কর্মকর্তার আদালতে প্রতিকারের আবেদন করার সুযোগ আছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালত অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশও দিতে পারে। 

অর্থাৎ আইন অন্তত কাগজে বলছে- একজন নির্যাতিত নারীকে নিজের লড়াই একা লড়তে হবে না। তাহলে বাস্তব প্রশ্ন হলো- এই অধিকারগুলো কি তার কাছে পৌঁছায়? একজন ১৯ বছর বয়সী নারী কি জানেন কোথায় গেলে তিনি নিরাপদ আশ্রয় পাবেন? 

পরিবার কি জানে কখন ‘সংসারের ব্যাপার’ বলে চুপ না থেকে আইনি সহায়তা নিতে হবে? পুলিশ কি জানে কখন একটি পারিবারিক অভিযোগকে সম্ভাব্য জীবন-ঝুঁকি হিসেবে দেখতে হবে? সমাজ কি জানে কখন একজন নারীর ‘সহ্য করার ক্ষমতা’ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে তাকে বেরিয়ে আসার পথ করে দিতে হয়? 

মরিয়মের মৃত্যুকে শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে এই প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। 

  • আর একটি বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। মরিয়মের বয়স ছিল মাত্র ১৯। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তার জীবন এমন এক পরিণতিতে পৌঁছেছে, যার প্রকৃত কারণ এখন তদন্তের বিষয়। তার হাতে লেখা চিরকুটের যে অংশ সংবাদমাধ্যমে এসেছে, সেখানে বিশ্বাস, পরাজয় ও ‘যুদ্ধের’ ভাষা আছে। 

এটা কোনো আদালতের রায় নয়, কিন্তু একজন মৃত তরুণীর মানসিক অবস্থার অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে তদন্তকারীদের কাছে এর মূল্য আছে। 

আমরা অবশ্যই চাইব, মরিয়মের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। তার পরিবার যে অভিযোগ করেছে, তার প্রতিটি দিক পরীক্ষা করা হোক। কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোন, আইনের আওতায় আসুন। 

একই সঙ্গে তদন্তে যদি অভিযোগের বিপরীত কোনো তথ্যও পাওয়া যায়, সেটাও স্বচ্ছভাবে সামনে আসুক। কারণ ন্যায়বিচার মানে আগে থেকেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়; ন্যায়বিচার মানে সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য ক্ষমতা, পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে তদন্ত করা। 

কিন্তু মরিয়মের মৃত্যুর সামাজিক শিক্ষা তারও বড়। আমরা চাই, নির্যাতিত নারী রুখে দাঁড়ান। চাই, তিনি ভয়কে জয় করুন। চাই, তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলুন। কিন্তু তার কাছে শুধু সাহস চাইলেই হবে না। সাহস দেখানোর পর তিনি কোথায় যাবেন, কে তার পাশে দাঁড়াবে, কে তাকে আইনি সহায়তা দেবে, কে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে- সেই ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে। 

কারণ একজন নারী যখন নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তার একার লড়াইকে সামাজিক লড়াইয়ে পরিণত করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। 

মরিয়ম হয়তো আর রুখে দাঁড়াতে পারবেন না। তার কণ্ঠ আর কোনোদিন শুনতে পাব না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমরা যদি শুধু বলি, ‘তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন?’- তাহলে প্রশ্নটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রশ্ন হওয়া উচিত- একজন ১৯ বছরের তরুণী যখন বলেছিলেন তিনি কষ্টে আছেন, তখন তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমরা কী করেছিলাম? 

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মরিয়মের পরিবারের কাছে নয়। এর উত্তর দিতে হবে আমাদের সমাজকে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে, আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এবং রাষ্ট্রকে। 

কারণ আগামী মরিয়মের কাছে শুধু এই প্রত্যাশা রাখা যায় না যে, তিনি একাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। তাকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে- তিনি যখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবেন, তখন তার জন্য নিরাপদ দরজা খোলা থাকবে।

লেখক : দীপু মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ও সমাজ চিন্তক 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!