বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কি পাপ
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক পাপ—এই বিশ্বাস থাকার পর বা এই জাতীয় ঘোষণা দেওয়ার পর যদি কেউ এই ধরনের সম্পর্কে জড়ায়, তাহলে সে কী খারাপ মানুষ হয়ে যায় ? যদি এই আচরণকে সে যৌক্তিক করতে চায়, যদি সে বলে— এটা বিশেষ পরিস্থিতি ছিল, এটা শয়তান তাকে দিয়ে করিয়েছে, বা কেউ যদি এই ঘটনাকে আড়াল করতে এআই এর ওপর দোষ চাপায় তা হলে তার বা তাদের মস্তিষ্ককে বলতে হবে অপরাধ প্রবণ মস্তিষ্ক।
আমাদের সমাজে মানুষ প্রায়শই একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চায়। এই ভাবমূর্তি তৈরি করে সমাজের নিয়ম। যে নিয়ম মানলে সে সামাজিক পুরষ্কার পেতে পারে বলে মনে করে। সামাজিক পুরষ্কার হচ্ছে— সুনাম, সম্মান, বিশ্বস, গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্ব ইত্যাদি। এই ভাবমূর্তি তিরি করতে গিয়ে মানুষ ভুলে যায় সে একজন ব্যক্তি মানুষও।
.png)
ব্যক্তি সত্তার ও কিছু পুরষ্কার দরকার। যেমন — আনন্দ, ঘনিষ্ঠতা, প্রেম, যৌন তৃপ্তি ইত্যাদি। তাই মানুষ প্রকাশ্যে সামাজিক মূল্যবোধের কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনের কাছে সে হেরে যায়। সাধারণ মানুষও ভুলে যায় সে একজন নেতা হলেও সে একজন প্রেমিক, সে একজন স্বামী এবং আলাদা যৌন সত্তা লালনকারী ব্যক্তিও।
ব্যক্তির এই পরিচয়গুলো সব সময় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। সামাঞ্জস্যপূর্ণ। হওয়াও সম্ভব নয়। ফলে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
এই দ্বন্দ্ব ব্যক্তির বাস্তব সত্তা ও আদর্শিক সত্তার দ্বন্দ্ব। বাস্তব সত্তা হলো মানুষের প্রকৃত অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, যৌনতা, দুর্বলতা, সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা এবং তার ব্যক্তিত্বের অবস্থা। একজন মানুষ যৌন আকর্ষন অনুভব করবে, রেগে যাবে, প্রেমে পড়বে, ঈর্ষা করবে এগুলো সবই হচ্ছে মানুষের বাস্তব সত্তার উদাহরণ। এগুলো ব্যক্তির নিজস্ব অনুভূতিগত বিষয়।
অন্যদিকে আদর্শিক সত্তা হচ্ছে সমাজ বা অন্যের চোখে মানুষ যেভাবে নিজেকে দেখাতে চায়। যেমন আমি খুব ভালো মানুষ হবো, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক খারাপ কাজেই এটা করব না, ধর্মে যা বলা আছে আমি সেই মতো চলব, সব সময় নৈতিক থাকব।
এইগুলো অন্যের এটেনশন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাজাত বিষয়। এই কারণে লোকেরা প্রকাশ্যে ধর্মকর্ম করে, প্রকাশ্যে গির্জায় যায়, প্রার্থনা করে, জপমালা টেপে এবং সামাজিক নৈতিকতার রক্ষার জন্য প্রাণপাত করে।
এবার যখন কেউ বলে— আমি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক মানি না কারণ এটা অপরাধ আর বাস্তবে তিনি যদি তা মেনে চলেন তবে তার বাস্তব সত্তা এবং আদর্শিক সত্তার সাথে সামাঞ্জস্য আছে বলে মনে করা যায়।
আবার কেউ যখন বলে— আমি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক মানি না কারণ এটা অপরাধ। কিন্তু তিনি যদি সেই কাজটি করেন এবং এই কাজের পক্ষে যুক্তি দেন, কিংবা অন্যের ওপর দোষ চাপান, কিংবা অপরাধকে আড়াল করতে অন্য গল্প তৈরি করেন তা হলে তিনি অপরাধ করেন। কিন্তু যদি ক্ষমা চান তা হলে তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে পারেন।
যখন একজন অন্যের প্রেমে পড়ে বা যৌন আকর্ষন অনুভব করে তখন এটি ব্যক্তির বাস্তব সত্তা। কিন্তু যখন তিনি বলেন, একজন ভালো মানুষ কখনও এইরকম অনুভব করতে পারে না তখন এটি হচ্ছে আদর্শিক সত্তা। এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তি নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করতে শুরু করে। এই দুটি সত্তার অমিল থেকে শুরু হয় ব্যক্তিত্বের সংঘাত। যে সত্তার শক্তি বা ক্ষমতা বেশি সে জয় লাভ করে।
দুঃখজনক হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের আদর্শিক সত্তাই পরাজয় বরণ করে। মানুষ তার আদর্শিক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং একই সাথে ব্যক্তির বাস্তব সত্তার অভিলাষ পূরণ করতে গিয়ে শুরু করে গোপন যাত্রা ।
পৃথিবীর প্রথম আধুনিক ধর্ম হিসেবে যেই ধর্মটি ডিভোর্সকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে সেই ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ার পরেও অনেকে ডিভোর্স দিয়ে বা মানসিক বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে আর একটি সম্পর্কে যেতে চায় না।
তারা সমাজকে দেখাতে চায় তারা কতটা আদর্শ কাপল, আবার পরকীয়ার ভেতর দিয়ে নিজের গোপন অভিলাষও পূরণ করতে চায়, যা প্রতারনা।(অন্য ধর্মের প্রসঙ্গ তুলিনি কারণ সেগুলিতে ডিভোর্স অনেক পরে স্বীকৃত, সেখানেও এই ধরনের মানুষ আছে)
তা হলে কেন মানুষ একই সঙ্গে দুটি সত্তাকে লালন করতে চায় ?
কারণ তারা বাস্তব সত্তাকে মেনে নিতে শেখে না। এইটা কেবল জামাতের লোকেরা করে তা নয়, এটি সমাজের অগ্রচিন্তার মানুষেরাও করে। কারণ আমাদের সমাজে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শর্তযুক্ত মর্যাদার মানদণ্ড রয়েছে যাকে বলে যোগ্যতার শর্ত। যেমন—ধর্মের নিয়ম মানলেই তুমি ভালো মানুষ, কিংবা ভালো মেয়ে হলেই তুমি সম্মান পাবে। অর্থাৎ নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি নিজেকে যোগ্য করে তৈরি করার বদলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের মাধ্যমে তাকে যোগ্য করে তৈরি করা হয়।
ধরা যাক, একজন শিশুকে ছোটবেলা থেকে শেখানো হলো—একজন ভালো মানুষ কখনো যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে না। কিন্তু বড় হওয়ার পর সে বুঝল যে তারও স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে। এখন তার সামনে রয়েছে দুটি পথ— বাস্তব সত্তাকে স্বীকার করা, অথবা আদর্শ সত্তাকে রক্ষা করার জন্য ব্যক্তির অনুভূতিকে অস্বীকার বা গোপন করা।
যদি সে দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়, তবে তার মধ্যে বাস্তব সত্তা ও আদর্শিক সত্তার মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। এর ফলে তৈরি হয় উদ্বেগ, অপরাধবোধ বা দ্বৈত জীবনযাপনের দিকে তাকে নিয়ে যায়।
গোপনীয়তা ধরা পড়লে তাকে নিয়ে ট্রোল হয়, তার আদর্শিক জীবন মুখ থুবড়ে পরে, জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ হয় এবং একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা গাঢ় হতে থাকে। বাংলাদেশে ভণ্ড মানুষের সংখ্যা বাড়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে মানুষের বা ব্যক্তির বাস্তব সত্তাকে অস্বীকার করা।
এই কারণে আমাদের সমাজে ১৫ পাওয়া মানুষেরাও ৮০ পাওয়া মানুষের যোগ্যতা নিয়ে উপহাস করে, বলে সে কেন ১০০ পেল না! মনে রাখতে হবে, মানুষ হচ্ছে মানুষ। সে শ্রেষ্ঠ তখনই হয় যখন বিবেচনা বোধ দ্বারা পরিচালিত হয়, নিজের কাজের দায় ও দায়িত্ব নিতে শেখে।
লেখক : রঞ্জনা বিশ্বাস, সমাজ চিন্তক, লেখক ও গবেষক