আজকের এই দিনে বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে হারিয়ে যান সাবেক টাইগার পেসার মানজারুল ইসলাম রানা। তার মৃত্যুর ১৬ বছরে ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য রানাকে নিয়ে লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।
২০০৭ সালের ১৬ মার্চ। ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে সূদুর উইন্ডিজে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। একদিন পরেই পোর্ট অব স্পেনে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এর আগে বেশ ফুরফুরে মেজাজে সময় কাটাচ্ছেন টাইগাররা।
.png)
উইন্ডিজে যখন ভারত বধের পরিকল্পনা চলছে, তখন প্রায় সাড়ে নয় হাজার মাইল দূরে খুলনায় শুরু হয়ে গেছে শোকের মাতম!
২০০৭ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা হয়নি বাঁহাতি পেসার মানজারুল ইসলাম রানার। এজন্য নিজেকে ফিট রাখতে খুলনাতে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজের প্রিয় বাইক চড়ে মাঠে গিয়ে নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন রানা। নিজেকে প্রস্তুত করে আবারো জাতীয় দলে ফিরবেন, হয়তো এমনটাই স্বপ্ন দেখছিলেন এ পেসার।
তবে সেই স্বপ্ন এক দুর্ঘটনাতেই শেষ! দিনটি ছিল শুক্রবার। অনুশীলন শেষে বাইকে চেপে বসেন মানজারুল ইসলাম রানা। বাইকের পেছনে উঠে বসেন জাতীয় লিগে তার সতীর্থ খেলোয়াড় সাজ্জাদুল হাসান সেতু। দুজনে রওনা হয়েছিলেন খুলনা শহরের অদূরে প্রিয় এক হোটেলে খাবার খেতে।
রানার বাইকটি তখন খুলনার বালিয়াখালি ব্রিজের কাছাকাছি। এ সময় রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে আসা এক অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় রানার বাইকের। এতে ঘটনাস্থলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

পরে গুরুত্বর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় তার বন্ধু সেতুকে। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিনেই পরকালে পাড়ি জমান টাইগার শিবিরের প্রিয় মুখ রানা।
অবশ্য রানার মৃত্যুর খবর পোর্ট অব স্পেনে পৌঁছাতে সময় লাগেনি। ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের আগ মূহুর্তে বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে খবর যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে রানার। এমন খবরে টাইগার শিবের নেমে আসে শোকের ছায়া।
ম্যাচ শুরুর আগে রানার মৃত্যুর খবরটি জানিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর খবরে মাশরাফী বলেছিলেন, ‘রানা, তু্ই এটা কি করলি?’
এরপর একে একে হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, সৈয়দ রাসেলরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রানার মৃত্যুর খবর শোনার পর টাইগার অধিনায়ক হাবিবুল বাশার মাশরাফীকে বলেছিলেন, ‘মাশরাফী, খেলতি পারবি?’ এমন প্রশ্ন শুনে যেনো ক্ষেপে গেলেন মাশরাফী, তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘কী কলেন সুমন ভাই? খেলতি পারবো না কেন? রানার জন্যি খেলতি হবে।’

রানার মৃত্যুর পরদিন ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামে বাশার-মাশরাফীরা। আর সে ম্যাচেই ভারতকে কাঁদিয়ে ৫ উইকেটের সহজ জয় তুলে নেয় বাংলার বাঘরা।
বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে দেশে ফেরার পর খুলনায় যান সাবেক টাইগার কোচ ডেভ হোয়াইটমোর। প্রিয় শিষ্যকে হাঁরিয়ে স্বান্তনা খুঁজতে রানার বাড়িতে গিয়েছিলেন। এরপর বাংলাদেশে আসলেই রানার পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। প্রিয় শিষ্যকে হয়তো আজও খুঁজে ফেরেন হোয়াইটমোর।
এদিকে প্রিয় বন্ধুকে স্মরণ করে ২০২০ সালে ফেসবুক লাইভে এসে মাশরাফী বলেছিলেন, আমিতো ওর রুমমেট ছিলাম, রানা, নাফিস আর আমি একসঙ্গে খেতে যেতাম। ওর একটা অভ্যাস ছিল, আলোতে ঘুমাতে পারতো না। আর আমি বাতি নেভালে ঘুমাতে পারতাম না। ফলে আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘুমাতাম ও জেগে থাকতো। আমি ঘুমিয়ে গেলে ও (রানা) রুম অন্ধকার করে ঘুমাতো।’
মৃত্যুকালীন সময়ে রানার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিন। যার ফলে সর্বকনিষ্ঠ প্রয়াত টেস্ট ক্রিকেটারের জায়গায় বসে যায় মানজারুল ইসলাম রানার নাম।
এদিকে রানাকে হৃদয়ের মনি কোঠায় ঠাই দিতে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ডের নাম বদল করে রাখা হয়েছে ‘মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ড’।
অকাল প্রয়াত রানা যদি আজ বেঁচে থাকতেন হয়তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে অবসরে যেতেন। হয়তো তরুণ তুর্কিদের বোলিং কোচিং করাতেন। কিংবা আপন আলোয় নিজেকে নিয়ে যেতেন বিশ্বসেরাদের কাতারে। কিন্তু মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় যেন সব আলো নিভে দিল।