ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

এস্তাদিও ন্যাসিওনাল ডিজাস্টার; ইতিহাসের ভয়ংকরতম ফুটবল ট্র্যাজেডি

আসাদুজ্জামান লিটন
প্রকাশিত: ১৭:২৬, ২৪ মে ২০২৩
এস্তাদিও ন্যাসিওনাল ডিজাস্টার; ইতিহাসের ভয়ংকরতম ফুটবল ট্র্যাজেডি
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আর্জেন্টিনার ডি বক্স লক্ষ্য করে একটি ক্রস করলেন পেরুর এক ফুটবলার। উদ্দেশ্য সফলভাবে লক্ষ্যভেদ করে সমতায় ফেরা। যার মাধ্যমে টোকিওতে অনুষ্ঠিতব্য ১৯৬৪ অলিম্পিক গেমসের ফুটবল ইভেন্টে তাদের জায়গা নিশ্চিতের পথে এগিয়ে দেবে। বলটা পেয়ে গেলেন ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টর কিলো লোবাটন। 

শট নেয়ার জন্য পা-টা বেশ ওপরেই তুললেন ভিক্টর। তবে এখানেই বাঁধল বিপত্তি। মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানে তার পা গিয়ে লাগে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের সঙ্গে। এদিকে ক্লিনশিট রক্ষায় সচেষ্ট আর্জেন্টাইন গোলকিপার অগাস্টিন সেজাস সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ডাইভ দিলেন। তবে এর মাঝেই বল রিবাউন্ড হয়ে জালে জড়ায়।

সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী এটি একটি ফিফটি ফিফটি কল। খেলার মাঝে এরকম প্রচেষ্টা হরহামেশাই হতো। লাতিন আমেরিকার ফুটবলেও এভাবে আক্রমণ অনৈতিক নয়। কিন্তু উরুগুয়ের রেফারি এদুয়ার্দো অ্যাঞ্জেল পাজোস বিষয়টি অনৈতিক মনে করেন এবং গোলটি বাতিল করেন।

Advertisement

সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে পেরুর লিমার এস্টাডিও ন্যাসিওনালের প্রায় ৫৩ হাজার দর্শক। তৎকালীন হিসেব অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগের এক ভাগ তখন গ্যালারিতে উপস্থিত। তখনও তারা জানতেন না, অল্প সময়ের মাঝে কি বিভীষিকার ভেতর পড়তে যাচ্ছেন তারা। দিনটি ছিল ১৯৬৪ সালের ২৪ মে। 

ম্যাচটি যতই শেষ সময়ের দিকে এগোতে থাকে ততই বাড়তে থাকে উত্তেজনা। দর্শকদের মতে বৈধ গোল বাতিলের ফলে দর্শকদের মনে দানা বাঁধতে থাকে অসন্তোষ। এরই মাঝে মাঠে ঢুকে পড়েন বোম্বা ও এডিলবার্তো কুয়েনকা নামের দুজন ব্যক্তি। বোম্বা সরাসরি রেফারি পাজোসের ওপর আক্রমণের চেষ্টা চালান। তবে কয়েক মিটার দূরে থাকতেই পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। 

এদিকে কুয়েনকাকে আটকে দেয় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কুকুর। তিনিও পুলিশের হাতে মার খেতে থাকেন। একদিকে বৈধ গোল না দেওয়া, অন্যদিকে দুজন সমর্থককে মার খেতে দেখে আর স্থির থাকতে পারেনি স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা। উত্তেজনার পারদ পৌঁছে যায় চরমে। গ্যালারি থেকে নানা বস্তু ছুঁড়ে মারতে শুরু করেন প্রায় সবাই।

সেই সঙ্গে স্টেডিয়ামের প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করেন অতি উৎসাহী অনেকে। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে টিয়ার গ্যাসের ক্যানিস্টার নিক্ষেপ করতে শুরু করে পুলিশ। যা বাতাসকে আরো ঘন করে তোলে। অল্প সময়ের মাঝে এত ঘটনায় অনেকেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং একসঙ্গে স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করেন।

স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ মানুষ এই চাপ নিতে পারেননি। ফলে স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে একেরপর এক ফুটবলভক্ত পদদলিত হতে থাকেন। কেউ কেউ জনতার স্রোতে পদদলিত অবস্থাতেই রাস্তা পর্যন্ত চলে যান। ম্যাচ শেষ হতে তখনও বাকি ছিল আরো ছয় মিনিট। তাই প্রায় সবগুলো বড় দরজাই বন্ধ ছিল। যা ভয়াবহতাকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ।

টানেলের ভেতরে একদিকে মানুষ বেরোতে পারছে না, অন্যদিকে বের হতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া জনতার চাপের পাশাপাশি পুলিশের ছোঁড়া কাঁদুনে গ্যাসে অল্প সময়ের মাঝে নিভে যায় বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন প্রদীপ। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর গ্যালারি, স্টেডিয়ামের দরজা থেকে শুরু করে রাস্তা, সবখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল হতভাগ্যদের লাশ।

আনুষ্ঠানিক হিসেব অনুযায়ী সেদিন ৩২৮ জন মানুষ মারা যান ও পাঁচ শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হন। যা কোনো ফুটবল ম্যাচে দুর্ঘটনার ফলে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। মৃতদের সিংহভাগই ছিলেন শ্বাসরোধ বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের শিকার।

ঘটনা এখানে শেষ হলেও হতো। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা স্টেডিয়ামের বাইরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাদের সামাল দিতে সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিতে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য একপর্যায়ে কৌশল পরিবর্তন করে পুলিশ। এবার টিয়ার গ্যাস না ছুঁড়ে সরাসরি গোলাবারুদ ছুঁড়তে শুরু করে তারা। 

অন্যদিকে উত্তেজিত জনতা বিভিন্ন বাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে লিমার একটি কারাগার থেকে ২১ জন বন্দীও পালাতে সক্ষম হয়। সে সময়ের অনেক প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন, তারা পুলিশের বন্দুকের গুলিতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক লোককে আহত বা নিহত হতে দেখেছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

ভয়ংকর এই ট্র্যাজেডি ও প্রাণহানির রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে ষাটের দশকে তদন্তের ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত ছিল না। পুলিশ ও সাধারণ জনগণ উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থেকে নানারকম তত্ত্ব উদ্ভাবন হলেও কোনোটিই পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি।

সব ঘটনার জন্য মাত্র দুজন ব্যক্তিকে তিরস্কারের সম্মুখীন হতে হয়। তারা হলেন জর্জে আজাম্বুজা (পুলিশ কমান্ডার), যিনি ভিড়ের মধ্যে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং বেঞ্জামিন কাস্তানেদা (বিচারক) যিনি তদন্তে নেতৃত্ব দেন। কাস্তানেদা নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস পর রিপোর্ট জমা দেন। এছাড়া তিনি তার কর্তব্য হিসাবে ৩২৮ জনের ময়নাতদন্তে উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হন। শ্বাস্তি হিসেবে তাকে জরিমানা করা হয়। এছাড়া আজাম্বুজাকে আড়াই বছরের (৩০ মাস) কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

আজ থেকে ৫৯ বছর আগের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এস্তাদিও ন্যাসিওনাল ব্যাপক এবং বারবার সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে এটি একটি আধুনিক, ২১ শতকের সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন স্টেডিয়ামগুলোর ভেতর একটি। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, ইতিহাসের ভয়ংকর সেই দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া শত শত লোকের জন্য এখনো কোনো ফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নেই এখানে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!