পটুয়াখালীর আউলিয়াপুর গ্রামের নাসিরউদ্দীনের মেজো মেয়ে নাসরিন। বর্তমান সময়ে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলাকে অনেকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলেও তিনি নিয়েছেন আরচ্যারি। কারণ, এই খেলাটি তার ভালো লাগে। আরচ্যারি- এ নামটির সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের মানুষের খুব বেশি পরিচিতি নেই। তবে ক্রিকেট-ফুটবলের মাঝে আরচ্যারির কল্যাণে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে অনেকেই জানেন। আরচ্যারিকে বাংলায় বলা যায় তীরন্দাজী বা তীর ধনুকের খেলা। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যত বড় বড় অর্জন, তার মধ্যে আরচ্যারিরও বড় অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের আরচ্যারিতে রোমান সানা কিংবা দিয়া সিদ্দিকীর পর যে নামটি জোরেশোরে উচ্চারিত হয় সেটি হলো নাসরিন আক্তারের নাম।
২০১৭ সালে সাউথ এশিয়ান আরচ্যারি চ্যাম্পিয়নশিপের মিশ্র ইভেন্টে রোমান সানার সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রতিবেশী দেশ ভারতকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতেন নাসরিন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ছয় বছরের এই ক্যারিয়ারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের হয়ে মোট ৪টি স্বর্ণ, ৬টি রুপা ও তিন ব্রোঞ্জসহ ১৮টি পদক লাভ করেন। নাসরিনের ক্যারিয়ারে যত সাফল্য তার বেশিরভাগই এসেছে গত বছর, অর্থ্যাৎ ২০২২ সালে।
.png)

গত বছরের মার্চে থাইল্যান্ডের ফুকেটে এশিয়া কাপ আর্চারি স্টেজ-১ এ তিনটি স্বর্ণ জেতেন নাসরিন। রিকার্ভ ব্যক্তিগত ইভেন্টের ফাইনালে স্বদেশি দিয়াকে হারিয়ে স্বর্ণের মুকুট পরেন বাংলাদেশের এই নারী আরচ্যার। মিশ্র ইভেন্টে রোমানের সঙ্গে জুটি বেঁধে জেতেন স্বর্ণ। এছাড়াও ফাহমিদা সুলতানাকে সঙ্গী করে দলীয় ইভেন্টে জেতেন স্বর্ণ। যার সুবাদে চলতি বছরের ২৮ মে বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসপিএ) পক্ষ থেকে পেয়েছেন ২০২২ সালের বর্ষসেরা আরচ্যার পুরস্কার। এছাড়াও ২০২১ বাংলাদেশ গেমসে সেরা হন নাসরিন।
২০১৪ সালে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ থাকাকালীন আরচ্যারি খেলা শুরু করেন নাসরিন। ওই সময়ে কলেজের শারীরিক শিক্ষক ও আরচ্যারি সংগঠক ফারুক ঢালীর হাত ধরে বাংলাদেশ আরচ্যারি ফেডারেশনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। তবে এর মধ্যে দেশের একটি সার্ভিসিং দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন নাসরিন। সে সময়ে সার্ভিসিং দলের ইন্ডিয়ান কোচ নিধিশ দাসের কল্যাণে তার পথচলা আরো সহজ হয়ে ওঠে। তার কল্যাণে আরচ্যারিতে আলাদাভাবে নাসরিনকে মানুষ চিনতে শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি আরচ্যারিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন অন্যরকমভাবে।

গত ১২ জুন দিবাগত রাত দেড়টায় নাসরিন যখন কঙ্গোগামী উড়োজাহাজে ওঠেন, তখনই আরচ্যারির সঙ্গে তার ছয় বছরের ভালোবাসার ইতি ঘটে। সেখানে যাওয়ার কারণে আগামী সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে চীনের হাংজু শহরে হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে খেলা হচ্ছে না তার। কর্মস্থলের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন তিনি।
কঙ্গো থেকে ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন নাসরিন। তিনি বলেন,
পরিবার থেকে দূরে আছি। এখানে নতুন পরিবেশ। মানিয়ে নেয়া একটু কষ্টকর। অনুশীলন করতে পারছি না। ট্রেনিং করতে পারছি না। জানি না কী হবে। কাজ শেষে দেশে ফিরতে এক বছরের বেশি সময় সময় লাগবে। ততদিন খেলা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে যাবো। তারপরও আমি কাজ শেষে খেলায় ফিরতে চাই।
নাসরিন কঙ্গো আসায় একটু আক্ষেপ করেন জাতীয় দলের আরচ্যারি কোচ ফ্রেডরিখ। শেষ যেদিন তার সঙ্গে কোচের দেখা হয়, নাসরিন জানান কোচের মন খারাপ। কোচ আক্ষেপ করে নাসরিনকে বলেছিলেন
‘তোমার মতো কাউকে খুঁজে পেলাম না। তোমার মতো কাউকে বানাতেও পারিনি। তোমাকে দরকার। তুমি ফিরে এসো।’
কঙ্গো থেকে কাজ শেষ করে খেলায় ফিরে আসাটা যে সহজ নয়, সেটাও মানছেন নাসরিন। এছাড়াও দেড় বছরে ফিটনেস কমে যাবে অনেকটাই। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি এই লড়াইয়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন? তবে নাসরিন বিশ্বাস করেন- তিনি সেটা পারবেন।