২০১৫: অস্ট্রেলিয়ার সিংহাসন পুনরুদ্ধার
কালের পরিক্রমায় ক্রিকেটে কত না পরিবর্তন। শুরুটা এক, এখন আরেক। এই যে ভিন্নতা তবু কমেনি রঙ, ভাটা পড়েনি উন্মাদনায়ও। চার বছর পেরিয়ে আবারো এলো বিশ্বকাপ। এবার প্রতিবেশী দেশ ভারতে বসবে ১৩তম আসরটি। তার আগে সেদিনের বিশ্বকাপগুলোতে চোখ বোলানো যাক।
বিশ্বকাপের আগের আসর নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের ১২ পর্বের প্রতিবেদনে আজ থাকছে ১১তম পর্ব-২০১৫: অস্ট্রেলিয়ার সিংহাসন পুনরুদ্ধার।
১৯৮৩ এর পর টানা তিনবার, বিশ্বকাপটা রীতিমতো নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিল অস্ট্রেলিয়া। মাঝে একটা আসরে তাদের সেই সম্পদে ভাগ বসায় ভারত। মুখবুঝে সেটা সইলেও মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা আক্ষেপ আগুন হয়ে জ্বলে ২০১৫ বিশ্বকাপে। হারানো রাজ্য ফিরে পেয়ে অজিরাও মহাখুশি।
.png)
সেবার তাসমান পাড়েই বসে ক্রিকেটের এই মহাযজ্ঞ। অনুমতিভাবে অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ফেভারিট সিট অলংকৃত করে আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত ও স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড। যেটা ছিল বিশ্বকাপের একাদশ আসর। সেই আসরে অংশগ্রহণ করে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। যেখানে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নামে কিউইরা।
কিন্তু কিউইদের সিদ্ধান্তটা উল্টো তাদেরই বিপদ ডেকে আনে। অজি বোলারদের তোপের মুখে পড়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ব্ল্যাকক্যাপসরা। শেষ পর্যন্ত গ্র্যান্ট ইলিওটের ৮৩ রানের সুবাদে ১৮৩ রানের ছোটখাটো পুঁজি পায় নিউজিল্যান্ড।
জবাবে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়ার এক মাইকেল ক্লার্কই ম্যাচের সিংহভাগ পথ দৌড়িয়ে ফেলেন। তার ব্যাট থেকে আসে ৭৪ রানের ঝলমলে এক ইনিংস। আর সেই ইনিংসে ওপর ভর করে নির্ধারিত ওভারের অনেক আগেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া। আর পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জয়ের দিনটাকে নিজের ক্যারিয়ারের বিদায়ী দিন হিসেবে বেছে নেন ক্লার্ক। এরপর আর অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে দেখা যায়নি তাকে। শুধু তাই নয়, সেদিনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গুডবাই’ বলে দেন ব্র্যাড হ্যাডিন, মিচেল জনসন এবং ড্যানিয়েল ভেটরিও।
বাংলাদেশের জন্য আসরটি ছিল আশা নিরাশার। যার মধ্যে সবচেয়ে স্বরণীয় জয় ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আসর শুরুর আগে যে বাংলাদেশকে নিয়ে নাক ছিটকায় ইংলিশরা, তাদেরই হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয় টাইগার বাহিনী। যা কিনা পরে বিশ্বকাপের সেরা জয়ের তালিকায় স্থান করে নেয়।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরিও পেয়ে যান ওই ম্যাচে। পাশাপাশি রুবেল হোসেনও বল হাতে আগুন ঝরান। সে ম্যাচে তিনি একাই নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। সবমিলিয়ে দলগত নৈপুণ্যে অ্যাডিলেডে দুর্দান্ত বাংলাদেশ ১৫ রানে জিতেছিল। তাতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে ইংলিশদের বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। যেটা এখন পর্যন্ত বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
অথচ বাংলাদেশ সেবার এতদূর যাবে কেউ কল্পনাও করেনি। প্রথম ম্যাচ ছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি, আফগানিস্তাবের বিপক্ষে। বাংলাদেশ শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ২৬৭ রান সংগ্রহ করে। জবাবে আফগানিস্তান ব্যাট করতে নেমে ১৬২ রানেই নিজেদের সব উইকেট হারিয়ে বসে। তাতে প্রথম ম্যাচেই ১০৫ রানের বিশাল জয় পায় বাংলাদেশ। পরের ম্যাচে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মোকাবিলা করতে হয়। যদিও বৃষ্টি বাধায় ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। যে কারণে নিয়ম অনুযায়ী উভয় দল ১টি করে পয়েন্ট ভাগ করে নেয়।

নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলংকা। সেই ম্যাচে লংকানরা শুরুতে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশকে ৩৩৩ রানের বিশাল টার্গেট ছুড়ে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ ৪৭ ওভার খেলে ২৪০ রানেই অল আউট হয়ে যায়। যে হারে পরের ধাপে যাওয়ার আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে আসে। পরের ম্যাচ ছিল অপেক্ষাকৃত দূর্বল প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ডের সাথে। বাংলাদেশের মানুষ আবারো আশায় বুক বাঁধে। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করে টাইগাররা।
সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে স্কটল্যান্ড ৩১৯ রান বড়সড় সংগ্রহ গড়ে। টার্গেট বড় হলেও তামিম-সাকিবরা দারুণভাবে সেটা টপকে যায়। তামিম করেন ৯৫ রান। আর মাহমুদউল্লাহ, মুশফিক, সাকিব পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলেন। ফলে ৪৮.১ ওভারেই বাংলাদেশ তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এরপর তো ইংলিশদের হারিয়ে ইতিহাসই গড়ে লাল সবুজের দেশটি।
একনজরে ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ-
আয়োজক দেশ: অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড
চ্যাম্পিয়ন দল: অস্ট্রেলিয়া
অংশগ্রহণকারী দল: ১৪
মোট ম্যাচ: ৪৯
সর্বোচ্চ রান: ৫৪৭ রান (মার্টিন গাপটিল)
সর্বোচ্চ উইকেট: ২২ উইকেট (মিচেল স্টার্ক ও বোল্ট)।