শট নেয়ার আগে বল রাখার নির্ধারিত স্থানে এসে নিচু হয়ে দেখে নিলেন, বল ঠিকঠাক আছে কিনা। এরপর একটু পিছিয়ে আসা। ধীরে ধীরে বলের দিকে দৌড়। সেই সঙ্গে প্রার্থনায় আর্জেন্টিনা দল, লুসাইল স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক, পৃথিবীর কোটি কোটি আলবিসেলেস্তে ভক্ত।
ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে ষষ্ঠ পদক্ষেপে শট নিলেন মন্টি। গোলপোস্টের ঠিক নীচের বাম কোণা বরাবর। লরিস লাফালেন ডান দিকে। সামান্য বাঁক খেয়ে জালে জড়াল আল হিলম নামের হালকা সোনালী রঙের বলটি। সেই সঙ্গে আনন্দে গর্জে উঠলেন আকাশী-নীল জার্সি পরা প্রতিটি ব্যক্তি। এই শটেই যে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতল আর্জেন্টিনা!
.png)
ডান দিকে ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তার কাছে যাওয়ার আগেই জার্সিটা খুলে কাঁদতে কাঁদতে মুখ ঢেকে ফেললেন মন্টিয়েল। এদিকে দলের অন্য সদস্যরা তখন আনন্দে ছুটোছুটি করছেন। একদল টাইব্রেকারের নায়ক মার্টিনেজের সঙ্গে, আরেক দল বিশ্বের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরে আছেন।
মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি তখন অস্থির হয়ে পায়চারী করছেন। একবার ডাগ আউটে যান, আবার মাঠে ফিরে এসে শিষ্যদের আনন্দ উদযাপন দেখেন। পানি খেয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন, তবে পারলেন না। একপর্যায়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন বাচ্চাদের মতো।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসবে ভাব। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট রাষ্ট্র বাংলাদেশে মধ্যরাত। ঘড়ির কাটা রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। সূর্যদয়ের দেশ জাপানে আর কিছুক্ষণ পর হবে ভোর। কিন্তু লুসাইল ছাড়িয়ে আর্জেন্টিনার জয়ের আনন্দ তখন ছড়িয়ে গেছে সবজায়গায়।
এই একটি জয়ের জন্য কতই না অপেক্ষা! দীর্ঘ ৩৬ বছর... ম্যারাডোনার হাত ধরে ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়। এরপর একটি করে আসর আসে। বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে খেলা শুরু করা। কিন্তু কখনো নক আউটে, কখনো ফাইনালে ভেঙে যায় স্বপ্ন। চোখের পানিতে ফিরে আসা বারবার।
একের পর এক ব্যর্থতায় কষ্টের উচ্চতা যেন পেরিয়ে যায় এভারেস্টকেও। অপেক্ষা, আক্ষেপ, হতাশা এবং আবার অপেক্ষা। ২০১৪ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে অল্পের জন্য শিরোপা জেতা হয়নি। এরপর ২০১৫ ও ১৬ দুইবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়। কষ্টে, হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসর।
সেই কষ্ট থেকে কিছুটা মুক্তি মিলেছিল কাতার বিশ্বকাপের এক বছর আগে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। কিন্তু অবিসংবাদিতভাবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হতে লিওনেল মেসির মুকুটে অভাব ছিল একটি বিশ্বকাপের। সেই সঙ্গে সোনালী ট্রফি জয়ের দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা। তাই এই আসরটি ঘিরে আরো একবার স্বপ্ন দেখেছিলেন আকাশী-নীল সমর্থকরা।
কাতারে যেন আগের আসরের সব হতাশাকে মুছে ফেলার লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। রাশিয়ার মাটিতে ক্রোয়েশিয়ার কাছে গ্রুপ পর্বে আর ফ্রান্সের কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডে হেরে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার দল দুটিকে যথাক্রমে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধ নেয় মেসিবাহিনী।
খাতাকলমে খুব শক্তিশালী না হলেও দল হিসেবে খেললে কী করা যায়, সেটাই কাতারে প্রমাণ করে আর্জেন্টিনা। দলের প্রতিটি সদস্য এই আসরে পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কখনো এঞ্জো ফার্নান্দেজ, কখনো অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার-জুলিয়ান আলভারেজ, কখনো নাহুয়েল মলিনা বা ফাইনালের মহাগুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার গোল… কোনটাকে ছোট করে দেখবেন?
রদ্রিগো ডি পলের মধ্যমাঠ সামলানো অথবা মার্কাস অ্যাকুনা, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, কুতি রোমেরো, মন্টিয়েলদের দেওয়াল হয়ে দাঁড়ানো। কৃতিত্বে পিছিয়ে নেই কেউই! তবে আলাদাভাবে বলতে হয় আরেকজনের কথা। তিনি এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচ হারার পর যেভাবে প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে টাইব্রেকারের মঞ্চে মাইন্ড গেমের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যেভাবে বিপর্যস্ত করেছেন তা নিয়েই তো আলাদা করে লেখা যাবে মহাকাব্য।
আর লিওনেল মেসি? একক নৈপুণ্যে দলকে বিশ্বজয়ে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। গ্রুপ পর্ব এবং নক আউটের প্রতিটি পর্যায়ে করেন গোল, গড়ে দেন ম্যাচের ভাগ্য। পেনাল্টি, ফ্রি কিক বা ওপেন প্লে থেকে গোল... কী করেননি তিনি! একেরপর এক রেকর্ড গড়েছেন, নিজেকে নিয়ে গেছেন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফাইনালে দলের প্রথম ও শেষ গোলটা এসেছে তার পা থেকে। এ যেন স্বপ্নযাত্রার চেয়েও বেশি কিছু!
ঠিক এক বছর আগে আজকের দিনে, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঘুচেছিল আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা। যেদিন কষ্টের হাজার রাতের পর আলবিসেলেস্তেরা পেয়েছিল সুখের সকালের দেখা। আর মেসির ক্যারিয়ারের একমাত্র আক্ষেপটাও ঘুচেছিল সেদিন, পেয়েছিলেন পূর্ণতা।
বিশ্বজয়ের মুহূর্তে ধারাভাষ্যকক্ষে পিটার ড্রুরি নামের একজন ‘কবি’ তখন যেন ভুল বলেননি, "Argentina, champions of the world. Again. At last. And the nation will tango all night long. 36 years ago since Maradona and Mexico, here finally is a nation's new throng of immortals. Scaloni will be fated, Messi will be sainted…"