সম্প্রতি এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাপস চন্দ্র পাল দীর্ঘদিন ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক হিসাব ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন তিনি। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কয়েকজন পরিচালক ও এমডি মতিউল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজেশে ব্যাংকের সাসপেন্স ও ব্যয় হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা সরানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটা, আসবাবপত্র সংগ্রহ এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলেও অভিযোগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
.png)
তাপস চন্দ্র পালের স্ত্রীর সিঙ্গাপুরে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, চিকিৎসার কিছু অর্থ ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার খরচও ব্যাংকের অর্থে বহন করা হয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, চিকিৎসাকালীন সময়ে ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা সিঙ্গাপুরে গেলে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যয়ও ব্যাংকের অর্থ থেকে পরিশোধ করা হয়।
ব্যাংকের ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটা, আসবাবপত্র সংগ্রহ এবং সিএসআর ব্যয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া, অনুমোদন, পণ্যের প্রকৃত মূল্য এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি পাওনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে তা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ভিপি, ২০২১ সালে এসভিপি, ২০২২ সালে ইভিপি এবং ২০২৪ সালে এসইভিপি পদে উন্নীত হন তাপস চন্দ্র পাল। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে পদোন্নতি পান। তার দ্রুত পদোন্নতির পেছনে কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরো দাবি করা হয়েছে, সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকার পরও তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন এফডিএ ও সিএফও কার্যালয়ে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করা হয়েছে বলে দাবি বরা হয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে করা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাপস চন্দ্র পাল বলেন, এটা নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। এ ধরনের কোনো প্রশ্ন এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এক টাকা নেওয়ার আপনার-আমার, কারও ক্ষমতা নেই। ব্যাংক থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘উইদাউট অ্যানি ডকুমেন্টস, উইদাউট অ্যানি প্রোপার অ্যাপ্রুভাল এক পয়সাও এদিক থেকে ওদিকে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। নিজেকে প্রশ্ন করুন—ইজ ইট পসিবল? ব্যাংকের টাকা ইচ্ছামতো নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ আছে? পদোন্নতি ও যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, সিএফও হওয়ার সকল যোগ্যতা আমার আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কী পেয়েছে না পেয়েছে আমার জানা নেই।
তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, এর জবাব আমরা ব্যাংক ও তার কাছে চাইব। যদি অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাই, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিদর্শনের সময় কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কারও নীরব সহযোগিতা ছিল কি না সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এসব বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মো: মতিউল হাসান এর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।