একই অবস্থ পটুয়াখালী সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও। সেখানকার উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান ইমরান জানান, সাধারণত এখান থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কনডম, খাওয়ার পিল, আইইউডি এবং ইমপ্লান্ট বিনামূল্যে প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে কোন সামগ্রী সরবরাহ না থাকায় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সেবা প্রত্যাশীরা এসে এসব উপকরণ না পেয়ে খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন।
এ চিত্র শুধু পটুয়াখালী সদর উপজেলারই নয়, পরিবার পরিকল্পনার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর চরম সংকট দেখা দিয়েছে গোটা দেশজুড়ে। চাহিদার তুলনায় সরকারি সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়। ফলে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ বিনামূল্যে পাওয়া এসব উপকরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে করে একদিকে যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে, অন্যদিকে দেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
.png)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক উপজেলা ও ক্লিনিকে বিনামূল্যে পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নেই। কেনাকাটা সংক্রান্ত জটিলতা এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করা জরুরি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে পাঁচ ধরনের জন্মনিরোধক (কনডম, খাওয়ার বড়ি (ওরাল পিল), আইইউডি (ইন্ট্রা ইউটারিন ডিভাইসেস), ইনজেকশন এবং ইমপ্ল্যান্ট) বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকে ডিজিএফপি। ২০২০ সাল থেকে চলে আসা এই সরবরাহ ঘাটতি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এসে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ‘পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি’ (এইচপিএনএসপি) অনুমোদিত না হওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কর্মসূচি থেকে সরে আসায় সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। সেই সংকটই এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশের মানুষের ব্যবহৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি অর্থাৎ ৩৭ শতাংশ আসে সরকারি খাত থেকে। এছাড়া বেসরকারি খাত থেকে ৫৭ শতাংশ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও) থেকে ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস থেকে আসে ৪ শতাংশ উপকরণ।
ডিজিএফপি’র তথ্যানুযায়ী, সরকারিভাবে সাধারণত মাসে ৬০ থেকে ৭০ লাখ পাতা (প্রতি পাতায় ২৮ বড়ি) খাওয়ার বড়ি বিতরণ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে অন্যান্য সামগ্রী বিতরণের সংখ্যা হচ্ছে ইনজেক্টেবল ৭ থেকে ১০ লাখ, কনডম ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি, ইমপ্ল্যান্ট ৩০ থেকে ৬০ হাজার এবং আইইউডি ১০ থেকে ১৪ হাজার। তবে সরকারিভাবে সামগ্রীগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারায় এসবের বিতরণ একেবারেই কমে এসেছে।
মাঠ পর্যায়ে এই স্থবিরতার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীতে। বিপাকে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। ফার্মেসি থেকে চড়া দামে এসব সামগ্রী কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্রমেই বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত ও মাতৃমৃত্যুর হার।
ইউনিসেফ’র এমআইসিএস প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ থাকলেও ২০২৫-এ তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪-এ। একই সময়ে, ২০২২ সালের তুলনায় আনুমানিক প্রায় ১৬ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, ৯ লাখ গর্ভপাত এবং সাড়ে তিন হাজার মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মেরি স্টোপস বাংলাদেশ এর লিড অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মনজুন নাহার বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকটে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে অনেককে গর্ভপাতের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। যা দেশের মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ঠিক সময়ে হাতের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না থাকার কারণে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফলে মাতৃমৃত্যুও বেড়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অপূর্ণ চাহিদার হার ও মাতৃমৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার যে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি আছে, তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজগুলো দ্রুত শুরু করা দরকার এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী আমদানি করা বা দেশে তৈরির ব্যবস্থা করে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার যে কার্যক্রম একসময় চলতো, সেটাকে আবার পুনরায় গতি সঞ্চার করতে হবে। সমাজের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যে ইনডেক্স বা মান, সেখানে অবনমন আমরা দেখব, এরমধ্যেই যেটি দেখতে শুরু করেছি।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের অতিরিক্ত পরিচালক (ড্রাগস্ এন্ড স্টোরস্) আ. ফ. ম. আরাফাত হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য অপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগবে। গত ৩ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই আমরা ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবো। এরপর হাতে পেতে যে কয়দিন লাগে। তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আশা করছি অক্টোবর নাগাদ সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।