ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]
স্থানীয় সরকার নির্বাচন

বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ

মুক্তার হোসেন
প্রকাশিত: ১৯:৩১, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। জাতীয়  নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য রাজনৈতিক পরীক্ষা। দেড় দশকেরও বেশি সময় পর বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দেওয়াই দলটির নীতি-নির্ধারকদের জন্য এখন মাথাব্যাথার বড় কারণ। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে দলটি একক প্রার্থী নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে। তবে দলটির এই কৌশল বাস্তবায়ন করা মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলটির নেতাকর্মীদের মাঝেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতেই রাজশাহী মহানগর বিএনপির এক অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারক ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গোটা বাংলাদেশে বিএনপির একক প্রার্থী সুনিশ্চিত করা হবে। বড় রাজনৈতিক দল হওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে কেন্দ্র এবং স্থানীয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে একজনকে চূড়ান্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। 

নীতি-নির্ধারকদের এই ভাবনার পেছনে একটি বড় কৌশলগত সমীকরণ কাজ করছে। তারা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে যদি একই দলের একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তবে দলের মূল ভোটব্যাংক বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সুযোগ নিতে পারে বর্তমান সংসদের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী। 

Advertisement

জামায়াত ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাগুলোতে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করে মাঠপর্যায়ে জনসংযোগ শুরু করে দিয়েছে। যেমন রাজশাহী সিটি জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল সাফ জানিয়েছেন যে, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থী ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং তারা একক প্রার্থী নিয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। এর পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে আইনিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশও স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় মোড়কে ভোটের মাঠে নামার গোপন ছক কষছে। আওয়ামী লীগ এই স্থানীয় নির্বাচনে তাদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরতে চাই এবং এটাকে আন্তর্জাতিক মহলে কাজে লাগাতে চায়। এমন একটি বহুমাত্রিক ও জটিল রাজনৈতিক ত্রিমুখী সমীকরণে নিজেদের জয় সুনিশ্চিত করতে বিএনপি হাইকমান্ডের সামনে একক প্রার্থী ফর্মুলার কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে।

বিএনপির এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি কাগজে-কলমে যতটা গোছানো এবং সহজ মনে হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ ততটাই কঠিন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সারা দেশের সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের দিকে তাকালে এই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রশাসক বা অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বেশ কিছু ইউনিয়ন পরিষদে এই ধরনের প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদে দলের সক্রিয় নেতাদের সদস্য বা দায়িত্বশীল পদে বসানো নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই তীব্র আপত্তি তোলা হয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিজেদের অনুকূলে নিতে এবং প্রশাসনে একক আধিপত্য বিস্তার করতেই ক্ষমতাসীন দল ইউপিগুলোতে দলীয় অনুসারীদের বসানোর এই বড় চক্রান্ত করছে। যা আসন্ন নির্বাচনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেবে এবং কে নির্বাচনে জিতল বা হারল তা সরকারের দেখার বিষয় নয়। সরকার চায় নির্বাচনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখতে। 

এই আইনি ও প্রশাসনিক বিতর্কের বাইরেও বিএনপির অন্যতম সংকটটি লুকিয়ে আছে তাদের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতির অন্দরে। গত জাতীয় নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সারা দেশের সংসদীয় আসনগুলোতে দলটির যে নতুন সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা এখন নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের অনুগত ও বিশ্বস্ত কর্মী-সমর্থকদের স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দলটির যে মূল সাংগঠনিক কমিটি বা জেলা-উপজেলা কমিটি রয়েছে, তাদের সাথে সংসদ সদস্যদের এক ধরনের অলিখিত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ দেড় দশক রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের জেলা কমিটি সমর্থন দিলেও, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা তাদের নিজস্ব বলয় ভারী করতে তুলনামূলক নতুন বা অনুগত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কেন্দ্র বনাম তৃণমূলের এই সমন্বয়হীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অভাব আগামী দিনে দলের ভেতরে বড় ধরনের কোন্দল সৃষ্টি করতে পারে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র দেখতে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের দিকে তাকানো যায়, যেখানে বর্তমান চেয়ারম্যান পদের জন্য বিএনপিরই অন্তত ৯ জন প্রভাবশালী নেতা ও সমর্থক কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং প্রত্যেকেই নিজেদের অনড় দাবি করছেন। তফসিল ঘোষণার পর এই বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে এক ছাতার নিচে আনা কতটা সম্ভব হবে তা সময়ই বলে দেবে।

বিগত সাধারণ নির্বাচনের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, দলটির তীব্র কড়াকড়ি সত্ত্বেও অন্তত ৭২টি আসনে বিএনপির নিজস্ব বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে লড়েছেন, যা দলের মূল প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেখানে দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর নিজস্ব ব্যক্তি পরিচিতি বেশি কাজ করে সেখানে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়ানোর প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দল ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে বিএনপির তৃণমূলের রাজনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে, যাকে দলের সিনিয়র নেতারা 'অনুপ্রবেশের রাজনীতি' হিসেবে দেখছেন। ক্ষমতার সুফল ভোগ করতে বিগত সরকারের অনেক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ভিড় করছেন। এর ফলে দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে যদি এই ধরনের নতুন কিংবা বিতর্কিত কাউকে একক প্রার্থী হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় তবে ত্যাগী কর্মীরা ভোটের বাক্সে নীরব অন্তর্ঘাত করতে পারেন, যা দলের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী কিংবা চট্টগ্রামের মতো বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোতেও সাম্প্রতিক সময়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। যা দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকেও বেশ চিন্তিত করে তুলেছে। তিনি ইতোমধ্যেই শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। 

দলের সিনিয়র নেতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য তৃণমূলকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো পকেট বা স্বজনপ্রীতি চলবে না। জনগণের মাঝে প্রার্থীর সুনির্দিষ্ট জনপ্রিয়তার ডাটা বা রিপোর্ট দেখেই কেবল মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান।

তৃণমূলের এই কর্তৃত্ব বজায় রাখার লড়াইয়ে বিএনপির হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত কতটা কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং মাঠপর্যায়ের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দিয়ে একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে তার ওপরই নির্ভর করছে স্থানীয় সরকারে বিএনপির সাফল্য। 

একদিকে মাঠপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা, অন্যদিকে দলের ভেতরের একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর পারস্পরিক রেষারেষি; এই দুই ফ্রন্টেই বিএনপিকে একসঙ্গে রাজনৈতিক লড়াই চালাতে হবে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. নঈম আকতার সিদ্দিক বলেন, বিএনপি যদি প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর বাকি প্রার্থীদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়, তবে অনেক নিশ্চিত আসনেই তাদের পরাজয়ের মুখ দেখতে হবে। যা মাত্র কয়েক মাস আগে ক্ষমতায় আসা দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য মোটেও সুখকর হবে না। এই নির্বাচন কেবল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তার যথার্থতা প্রমাণ এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার এক মহাযুদ্ধ।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও জাতীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ নির্দলীয় এবং সাধারণ প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে।

বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে হবে এবং কোনোভাবেই একাধিক বা বিদ্রোহী প্রার্থী রাখা যাবে না। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকে ডেকে বোঝানো এবং সমঝোতার চেষ্টা করা হবে। এরপরও শৃঙ্খলা না মানলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আই এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!