অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে শুধু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা জব্দ হয়েছে। এর পরিমাণ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ১ কেজি। জব্দ করা এসব সোনার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তবে দেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনা চোরাচালান হচ্ছে, তার তুলনায় উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ খুবই সামান্য।
আকাশপথে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধ সোনার চালান দেশে ঢুকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নানা কৌশলে অভিযান চালিয়েও চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
.png)
বাজুসের একটি সূত্র জানায়, আকাশপথে দেশে আসা সোনা পরে আটটি সীমান্ত জেলার অন্তত ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বাহকদের গ্রেপ্তার করা হলেও চোরাচালানের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কাতার ও হংকং থেকে চোরাই পথে দেশে সোনা আসছে। এর প্রধান প্রবেশপথ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সূত্র জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে দেশে আসা সোনা ও অলংকার থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র ২৩৮ কোটি টাকা। ঢাকা কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি সোনা জব্দ করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে চালানের সংখ্যা কমলেও চালানের আকার বড় হয়েছে। চলতি বছরেও কয়েকটি বড় চালান জব্দ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা চোরাচালান চক্রের সাহসিকতা এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তার ইঙ্গিত দেয়।
কেস স্টাডি-১: টয়লেট প্যানেল থেকে ১৭ কেজি সোনা
গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেলের ভেতর থেকে ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এসব বারের মোট ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।
এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, কার্গো কর্মীদের সহায়তায় সোনার চালানটি লুকানো হয়েছিল এবং বিমান অবতরণের পর দ্রুত তা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। এ ঘটনায় বাহকদের গ্রেপ্তার করা হলেও মূল চক্রের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, টয়লেট প্যানেলের মতো সংবেদনশীল স্থানে এত বড় চালান লুকাতে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার প্রয়োজন হয়ে থাকে।
কেস স্টাডি-২: কার্গো হোল্ডে ১৮ কেজি সোনা
গত ২ জুলাই আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম ওজনের ১৬০টি সোনার বার জব্দ করা হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
মামলার নথি অনুযায়ী, চালানটি দুবাই থেকে সরাসরি আনা হয়েছিল এবং বিমানবন্দরের ভেতরেই তা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। তদন্তে কার্গো হোল্ডে সোনা লুকানোর জন্য পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এ মামলাতেও শুধু বাহক পর্যায়ের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল অর্থের জোগানদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে এখনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
কেস স্টাডি-৩: ফলের ক্রেটে ১৬ কেজি সোনা
গত ১৯ জুলাই ক্যাথে প্যাসিফিকের একটি কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে আসা রাম্বুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি কাঠের ক্রেট থেকে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
মামলায় বলা হয়, চালানটি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর নামে বুক করা হয়েছিল এবং ফলের ক্রেটকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, সাধারণ স্ক্যানিংয়ে সহজে ধরা না পড়ায় এ ধরনের পদ্ধতি চোরাচালানিদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ মামলাতেও মূল চক্রের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
কেস স্টাডি-৪: বিমানবন্দরের বাইরে গাড়ি থেকে সোনা
গত ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরে একটি গাড়ি থেকে ১ দশমিক ৮১২ কেজি সোনার বার ও শিট উদ্ধার করা হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ ঘটনায় গাড়িচালক ও তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর দ্রুত স্থলপথে সোনা পাচারের পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে শুধু বিমানবন্দর নয়, বিমানবন্দরের বাইরের পরিবহন নেটওয়ার্কও চোরাচালান চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
এসব ঘটনায় চোরাচালানিদের ব্যবহৃত নানা কৌশলের তথ্য পাওয়া যায়। কখনো টয়লেট প্যানেল, কখনো কার্গো হোল্ড, কখনো ফলের ক্রেট আবার কখনো গাড়িতে করে সোনা পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের ট্যাক্স ও কমিশন দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাগেজ রুলের সুযোগ নিয়ে সোনার বার আনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পায়ুপথে, জামার সুতার মধ্যে এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতরেও সোনা আনার কৌশল ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মী অর্থের বিনিময়ে বড় চালান নিরাপদে বের করে দিতে সহায়তা করেন। অনেক সময় চোরাচালান চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কোনো কোনো চালান ধরা পড়ে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সোনা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আকাশপথে দেশে আসা সোনার প্রায় ৯০ শতাংশই স্থলপথে ভারতে পাচার হয়ে যায়। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো এ চোরাচালানের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভারতে সোনার ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক থাকায় বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। বাংলাদেশে ১০ গ্রাম সোনার শুল্ক মাত্র ১৫০ টাকা, বিপরীতে ভারতে তা প্রায় ৪ হাজার টাকা।
যশোর সীমান্তকে দুবাই-ঢাকা-ভারত রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যশোরে ২০২৪ সালে ১৫১ কেজি, ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫ কেজি এবং ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৪ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সীমান্ত এলাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে বিজিবি ৬০ কেজির বেশি সোনা উদ্ধার করে। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জব্দ হওয়া সোনার পরিমাণ প্রকৃত চোরাচালানের ১০ শতাংশেরও কম।
ঢাকার বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের অভিযোগে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে।
শুধু গত এক বছরে বিমানবন্দর থানায় ৯২টি মামলা হওয়া থেকে বোঝা যায়, চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এসব মামলার বেশিরভাগই বাহকদের বিরুদ্ধে। মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
সোনা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাগেজ রুলের অপব্যবহার, শুল্কের ব্যবধান এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তার কারণে দেশে সোনা চোরাচালান কমছে না।
দেশে সোনার বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন। তবে চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ সোনা শুল্কায়নের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। ২০২২ সালে শুল্কায়নের মাধ্যমে অন্তত ৫৪ টন সোনা দেশে এসেছে। এর বাজারমূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সোনার বড় অংশই পরে স্থলপথে অন্য দেশে পাচার হয়ে যায়।
সোনা চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বাজুসের মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন বলেন, সোনা চোরাচালান রোধে বাজুস সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। আমরা চাই বাংলাদেশে অবৈধ পথে সোনা আসা কিংবা চালান হওয়া বন্ধ হোক। তাতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে এবং সরকারও রাজস্ব হারাবে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে জুয়েলারি শিল্প একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সোনার দামের অত্যধিক ওঠানামার কারণে সাধারণ ক্রেতারা গয়না কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তার মধ্যে যদি অবৈধভাবে সোনা চোরাচালান ঘটতে থাকে, তাহলে সোনা খাতের ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বৈধ আমদানি থেকে যে রাজস্ব আসছে, তা চোরাচালানের তুলনায় নগণ্য। ব্যাগেজ রুল সংশোধন এবং স্ক্যানিং প্রযুক্তি আরও জোরদার করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ভাঙতে সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।
বিজিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু মূল নেটওয়ার্ক আকাশপথে। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নইলে শুধু বাহক ধরে সমস্যার সমাধান হবে না।
অর্থনীতিবিদ ও সোনাবাজার বিশ্লেষক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সোনার শুল্ক এত কম যে এটি আন্তর্জাতিক চোরাচালানিদের জন্য লোভনীয় হয়ে উঠেছে। ভারতে উচ্চ শুল্কের কারণে তারা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারকে অবিলম্বে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে অভিজ্ঞ আবদুল করিম বলেন, আমি দেখেছি কীভাবে সিভিল এভিয়েশন ও কাস্টমসের কিছু কর্মী অর্থের বিনিময়ে চালান পাস করে দেয়। প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ালেও মানবিক সহায়তা বন্ধ না হলে সফলতা আসবে না। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে চোরাচালান চলতেই থাকবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাইফুল ইসলাম বলেন, সোনা চোরাচালান এখন জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। এর মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে, সন্ত্রাসী তৎপরতায় অর্থ সরবরাহ হতে পারে। বিমানবন্দর ও সীমান্তে সমন্বিত গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান বাড়িয়ে সোনা চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যাগেজ রুল সংস্কার, শুল্ক কাঠামোর সমন্বয়, বিমানবন্দরে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার, অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন।
চোরাচালানের এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা জরুরি। তা না হলে প্রতিদিন বিপুল অর্থের অবৈধ সোনা দেশে প্রবেশ করে অর্থনীতি, রাজস্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করতে থাকবে।