জানা গেছে, বিশ্বের প্রথম ডেঙ্গু মহামারি রেকর্ড করা হয় ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। ১৯৫০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে এর সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ১৯৬৩ সালে ভারতের কলকাতায় এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। সে সময় রোগটিকে স্থানীয়ভাবে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে সরকারিভাবে ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়। এতে রোগটি দেশে রোগতাত্ত্বিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেতে থাকে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও ডেঙ্গু মোকাবিলায় দক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।
এ বিষয়ে পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট (ইলেকট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, শুরু থেকেই সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের হলেও তাদের কার্যক্রম মূলত ফগিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রোগীর ওপর কার্যকর নজরদারি হয় না। রোগী বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই রোগীর সংখ্যা কমাতে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করতে হবে। জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
.png)
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হয়েছে। এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, মশা মারার আগে তার জীবনচক্র, প্রজনন ও অবস্থান বোঝা দরকার। স্যানিটেশন ও পানি ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকায় মশার ডিম পাড়ার স্থান বাড়ছে। শুধু ফগিং করে মশা তাড়ালে তা কার্যকর হবে না। আবার দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করলে মশা তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ওষুধ প্রয়োগের পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ না করলে তার কার্যকারিতা বোঝা যায় না। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে রোগী ও তার অবস্থান শনাক্ত করে (কন্ট্রাক ট্রেসিং) সেই এলাকার মশা নির্মূলের ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এটি মশা নির্মূলের সঙ্গে সমন্বিত না হওয়ায় রোগী যেখানে আক্রান্ত, সেখানে মশা বেঁচে থেকে বংশবিস্তার করে। এটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তোলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ০৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১ হাজার ৩২ জন এবং মারা গেছেন ১১৩ জন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৩৭৯ জন এবং মারা গেছেন ১০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ৬ হাজার ১৭৮ জন এবং মারা গেছেন ৮ জন, ঢাকায় (সিটি কারপোরেশনে বাইরে) আক্রান্ত ৬ হাজার ১৭ জন এবং মারা গেছেন ৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে আক্রান্ত ৪ হাজার ৮৯৫ জন এবং মারা গেছেন ১৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আক্রান্ত ৫ হাজার ৫০০ জন এবং মারা গেছেন ৩৯ জন, খুলনায় আক্রান্ত ৬ হাজার ৪৮৭ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন, ময়মনসিংহে আক্রান্ত ২ হাজার ২৫৭ জন এবং মারা গেছেন ১২ জন, রাজশাহীতে আক্রান্ত ২ হাজার ২৩০ জন এবং মারা গেছেন ৪ জন, রংপুরে আক্রান্ত এক হাজার ৫ জন এবং মারা গেছেন একজন, সিলেটে আক্রান্ত ১৮৪ জন এবং মারা গেছেন একজন।
সূত্র জানায়, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন, জুন মাসে দুই হাজার ৯০৭ জন, জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন এবং চলতি আগস্ট মাসে ১৮ হাজার ২৭৬ জন। এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে জানুয়ারি মাসে মৃতের সংখ্যা ছিল ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইতে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরের গত ৫ দিনে ১৬ জন মারা গেছেন।
সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে প্রকাশিত এ পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতালের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেসব রোগী বাসাতেই চিকিৎসা নেয় বা ডেঙ্গু হওয়ার কথা আদৌ জানেও না, তাদের সংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গু রোগীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও কয়েক গুণ বেশি। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের জরুরি সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জরুরি সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করা হলে দায় এড়ানোর প্রবণতা থাকবে না এবং সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের যে অ্যাপ্রোচ সেটা বদলে ফেলতে হবে। যেমন মশা নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র রাসায়নিক ধোঁয়া আর রোগীর জন্য প্রস্তুতি মানে আইসিইউর ব্যবস্থা করা। দুটোর কোনটাই রোগীর সংখ্যা এবং রোগীর জটিলতা রোধে কোন ভূমিকা রাখে না। এক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে সারা দেশে সারা বছর মশা খোঁজা, রোগী খোঁজা এবং পরিচ্ছন্নতা এই তিনটি কাজ এক সাথে করতে হবে। এতে সরকারের পয়সা খরচ হবে। কিন্তু যে পয়সা খরচ হবে তার চেয়ে আইসিইউ খরচ অনেক বেশি।
তিনি আরো বলেন, এটা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, স্থানীয় মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মা ও শিশু মন্ত্রণালয়কেও থাকতে হবে। সমন্বিত ভাবে সবাইকে কাজ করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্ষাকালে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলেও বছরের অন্যান্য সময়েও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস ইজিপ্টাই আমাদের নগর পরিবেশে এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে রোগটির ঝুঁকিও ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রচলিত মৌসুমি প্রস্তুতি যদি একইভাবে চলতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তিনি বলেন, শুধু রোগীর চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও নার্সের প্রস্তুতি, জরুরি ওষুধ সরবরাহ, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য চিকিৎসা নির্দেশিকা এবং হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো মূলত রোগ দেখা দেওয়ার পরের ব্যবস্থা। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যদি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়, সেটিই হবে অধিক কার্যকর এবং টেকসই জনস্বাস্থ্য কৌশল।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে আজ রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে এবং মাঠে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।