ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]
‘কিংব্যাক’-এর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

মোনেম মুন্না: রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ১৭:৩৯, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
মোনেম মুন্না: রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী
মোনেম ‍মুন্না। ছবি- সংগৃহীত

একুশ শতকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে চলছে ক্রিকেটের দাপট। চায়ের কাপ থেকে বন্ধুমহলের আড্ডা সবখানেই বাইশ গজের গল্পবাজি। এমনটাই তো হওয়া স্বাভাবিক! এর বাইরে কি অন্য কোনো খেলা হয় নাকি দেশে?

রসিকতার ভঙ্গিতে কথাগুলো লিখলেও বাস্তবটা কিন্তু তাই-ই। ক্রিকেট নিয়ে দেশে যেভাবে আলোচনা হয়, ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই উন্মাদনা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। কিন্তু গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের দশকে চিত্র কিংবা প্রেক্ষাপট দুটোই ছিল ভিন্ন।

স্বাধীন পরবর্তী সময়ে দেশের ঘরোয়া ফুটবল নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। আর হবেই বা কেন? লাল-সবুজের ডেরায় যে তখন কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন চুন্নু, রিজভী করিম রুমি, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ও বাদল রায়দের শাসন। এই তারকা ফুটবলারদের মধ্যে আলোকরশ্মির মতো উত্থান হয়েছিল রক্ষণভাগের এক অতন্দ্র প্রহরীর। যিনি পরিবর্তীতে ‘কিংব্যাক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

Advertisement

ফুটবল মাঠের সেই প্রহরীকে নিয়ে জার্মান কোচ অটো ফিস্টার বলেছিলেন, ‘সে হয়তো ভুলবশত বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে।’ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি লিগ দাপিয়ে বেড়ানো সেই কৃতি ফুটবলারের নাম মোনেম মুন্না। আজ তিনি শুধুই স্মৃতি, দূর আকাশে জ্বল জ্বল করা তারা।

বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালি ইতিহাসের সেই মহানায়ক মুন্নার ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে চলে যান ‘কিংব্যাক’ খ্যাত এই তারকা।

১৯৯০ বেইজিং এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন মোনেম মুন্না। ছবি- সংগৃহীতমোনেম মুন্নাকে দূরে ঠেলে দিয়ে কখনোই লেখা যাবে না বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাস। চাইলেও ভুলতে পারবেন না তাকে, নানা গল্প, স্মৃতি আর অর্জন নিয়ে কিংব্যাক আপনার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যাবে নিশ্চিতভাবে।

মোনেম মুন্না শুধু বাংলাদেশ নন, তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবলার। ক্যারিয়ারের মাঝামাঝিতে খেলেছেন কলকাতার ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের হয়েও। কাঁটা তারের ওপারের মানুষগুলোর কাছেও মুন্নার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী।

সাধারণত ফুটবল ম্যাচে ফরোয়ার্ড কিংবা উইঙ্গারের দিকে পাখির চোখ করে রাখেন সমর্থকেরা। সেই তুলনায় নিচের পজিশনে যারা খেলেন তাদের দিকে খুব একটা আলো আসে না। মাঝমাঠের তুলনায় একটু আঁধারেই থাকেন তারা। তবে মুন্নার বেলায় মুদ্রার উল্টাপিঠ। রক্ষণভাগে খেলেও সমস্ত আলো নিজের দিকে কেড়েছেন এক মুন্না। দলের নেতৃত্ব আর দুর্দান্ত পেশাদারিত্ব দেখিয়ে তিনি বাংলাদেশ ফুটবলে রীতিমতো ‘কিংবদন্তি’ বনে গিয়েছিলেন।

আবাহনীর জার্সিতে সতীর্থদের সঙ্গে মোনেম মুন্না। ছবি- সংগৃহীতসালটা ১৯৮১। এ বছর ঢাকার মাঠে অভিষেক হয় মুন্নার। সেবার পাইওনিয়ার লিগে গুলশান ক্লাবের হয়ে মাঠে নামেন তিনি। এরপর শান্তিনগরের জার্সিতে খেলেছেন দ্বিতীয় বিভাগ। পরের বছরই চুক্তিবদ্ধ হন মুক্তিযুদ্ধা সংসদের সাথে। ঐ বছরই চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ঘরে তোলে মুক্তিযোদ্ধা। 

১৯৮৬ সালে ঢাকঢোল পিটিয়ে ব্রাদার্স ইউনিয়নে যোগ দেন মোনেম মুন্না। পেশাদার ফুটবল লিগে মাঠ মাতিয়ে জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়েন তিনি। এই বছরই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলেন ডিফেন্স পজিশনে খেলা এ ফুটবলার।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিউল এশিয়ান গেমসে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ান মুন্না। এরপর দু-একটি ম্যাচ বাদ দিলে টানা ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত লাল-সবুজের জার্সিতে খেলেছেন এই ডিফেন্ডার।

১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে জাতীয় দলের হয়ে প্রথমবার মাঠে নামেন মুন্না। ছবি- সংগৃহীতব্রাদার্সের বছর খানেক খেলার পর ১৯৮৭ সালে আবাহনীতে পাড়ি দেন মুন্না। সেই থেকে ক্লাব ফুটবলের বাকি সময়টা কাটান আকাশী-নীল শিবিরে। ১৯৯১ মৌসুমের দলবদলে মুন্না আবাহনীতে খেলেছিলেন সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পারিশ্রমিকে। ক্লাবটির হয়ে ক্যারিয়ারে পাঁচবার ঢাকা লিগ এবং তিনবার ফেডারেশন কাপের শিরোপা জেতেন তিনি। 

এর মাঝে ১৯৯১-৯২ সালে কলকাতার ইস্ট বেঙ্গলের হয়েও মাতিয়ে আসেন পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে মুন্না প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান। তার নেতৃত্বেই ১৯৯৫ সালে মিয়ানমার থেকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতে ঘরে ফেরে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যা প্রথম সাফল্য। তার অধিনায়কত্বেই ১৯৯৫ সাফ গেমসে বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়েছিল। 

১৯৯৭ এর ৩১শে মার্চ মুন্না ৩০ বছর বয়সে দেশের পক্ষে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন মুন্না। সৌদি আরবের জেদ্দায় প্রিন্স আবদুল্লাহ আল ফয়সাল স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল মালয়েশিয়া।

ধানমণ্ডির মোনেম মুন্না সেতু। ছবি- সংগৃহীতমাঠের ফুটবল থেকে অবসর নিলেও সর্বদা ছিলেন ফুটবলের সাথেই। এরপর কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হন তিনি। আর ২০০৫ সালের আজকের এই দিনে (১২ ফেব্রুয়ারি) মৃত্যুর কাছে হার মানেন মুন্না। সেই দিন থেকে আজ, পেরিয়ে গেছে দেড় যুগ; আর মোনেম মুন্নাও এখন শুধুই সোনালী অতীত।

২০০৮ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন মুন্নার স্মরণে ধানমন্ডির ৮ নম্বর সেতুটির নাম ‘মোনেম মুন্না সেতু’ নামকরণ করে। মোনেম মুন্না সেতু যেটা আমরা অনেকেই জানি না। অযত্মে অবহেলায় ফলক চোখ এড়িয়ে যায়।

‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’-এজন্যই হয়তো এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে ‘কিংব্যাক’ মুন্নার কথা। স্মৃতিতে আছেন, থাকবেন রয়ে যাবেন লাল-সুবজের অতন্দ্রী প্রহরী মুন্না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআইএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!