চার বছরেরও বেশি সময় আগে যে রাওয়ালপিন্ডিতে থেমেছিল সিরিজ, ঠিক সেই ভেন্যু থেকেই আবার পাকিস্তান সফর শুরু করবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত স্টেডিয়ামটিতে ১৯৯৩ সালে হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম টেস্ট। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠটির অভিষেক টেস্টে ৫২ রানে স্বাগতিকরা জিতেছিল।
ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিখ্যাত রাওয়ালপিন্ডি প্রাচীন ইন্দো-আর্য সভ্যতার নিদর্শন আজও বহন করছে। বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ অঞ্চল হিসেবে এটি পরিচিত। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অন্তত ৫৫টি ধ্বংসস্তূপ, ২৮টি বৌদ্ধ বিহার, ৯টি মন্দির রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত (বর্তমান পাকিস্তান) থেকে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন মানুষের ব্যবহৃত প্রাচীন ভারতীয় লিপির (খরোষ্ঠী লিপি) নিদর্শনও স্থানটিতে মিলেছে।
.png)
রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পরিসংখ্যান বলছে ভেন্যুটি ১৩ টেস্ট, ২৬ ওয়ানডে ও ৮ টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের সাক্ষী। ব্যাটার ও বোলারদের কারোর একচেটিয়া প্রাধান্য নয়; বরং ভারসাম্যপূর্ণ পিচের জন্য মাঠটি বিখ্যাত। ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামের দর্শকরা সাধারণত ম্যাচজুড়ে ব্যাটার ও স্পিনারদের কার্যকরী হতে দেখে। ম্যাচের শুরুতে নতুন বলে ব্যাটাররা কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন না, স্কোরবোর্ডে রান তোলা সহজই বলা চলে।
আগে বোলিং করা দল পিন্ডিতে টেস্ট জিতেছে ছয়বার, হেরেছে তিনবার। বাকি চার খেলার ফল ছিল ড্র। ম্যাচের প্রথম ইনিংসের রান তোলার গড় ৩৩৮, দ্বিতীয় ইনিংসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০১। তৃতীয় ইনিংস থেকে বোলাররা সুবিধা পেতে থাকেন, রানের গড় তাই ২৫৩-তে নেমে যায়। শেষ ইনিংসে সেটি দুইশোরও নিচে নামে, সংখ্যাটা ১৯২।
বাংলাদেশের অতীতটা এ মাঠে মোটেও সুখকর নয়। মুমিনুল হকের নেতৃত্বাধীন দলকে এর আগে পেতে হয়েছিল ইনিংস ও ৪৪ রানের শোচনীয় পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ। সফরকারীরা দ্বিতীয় ইনিংসে নাসিম শাহর তোপের মুখে পড়ে। নাজমুল হোসেন শান্ত, তাইজুল ইসলাম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে টানা তিন বলে সাজঘরে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিক করেন এই পাকিস্তানি পেসার।
সেবার হ্যাটট্রিক বলটি অফ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে বেরিরে যাওয়ার পথে থাকলেও রিয়াদ অযাচিত ড্রাইভ শট খেলেন। অবিশ্বাস্য ভুলের খেসারত দিয়ে স্লিপে হারিস সোহেলের হাতে ধরা পড়েন। তৃতীয় দিনের শেষ বিকেলে তার এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যাটিং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
পাকিস্তানের ঘোষিত স্কোয়াডে আছেন তারকার তকমা গায়ে লাগিয়ে ফেলা নাসিম শাহ ও শাহিন শাহ আফ্রিদি। তাদের সঙ্গে আমের জামাল, আবরার আহমেদ, খুররম শেহজাদ, মীর হামজা এবং মোহাম্মদ আলী। আগা সালমান, সাইম আইয়ুব ও সৌদ শাকিলও দলের প্রয়োজনে বোলিং করে থাকেন।
ব্যাটারদের জন্য রাওয়ালপিন্ডির উইকেট খেলার উপযোগী হলেও বাংলাদেশ দলের সেই সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। জাতীয় দলে শুধুমাত্র লাল বলের ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া মুমিনুল হক এ বছর ৪ ইনিংসে ৫৮.৩০ গড়ে দুই ফিফটিসহ করেছেন ১৭৫ রান। তার ব্যাটের দিকে দল অনেকটাই তাকিয়ে থাকবে।
২০২২ সালের এপ্রিলের পর কোনো টেস্টই খেলেননি সাদমান ইসলাম অনিক। অ্যাওয়ে কন্ডিশনে স্বাগতিক দলের বোলারদের চ্যালেঞ্জ সামলানো আদৌ তার পক্ষে কতটা সম্ভব, তা পরিষ্কার নয়। বাঁহাতি এই ওপেনার ১৩ টেস্টে ২৩ এর অধিক গড়ে এক সেঞ্চুরি ও দুই ফিফটিতে করেছেন ৫৫৯ রান।
ঘরের মাঠে পাকিস্তানের সঙ্গেই ২০২১ সালে অভিষেক টেস্ট খেলা মাহমুদুল হাসান জয় ২০২৪ সালে রানখরায় রয়েছেন। চার ইনিংসে তার ব্যাটে ৫৭ রানের বেশি আসেনি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর অবস্থা আরো শোচনীয়। এ বছর চার ইনিংসে তিনি ৩২ রানের বেশি করতেই পারেননি।
মাঠের ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স ও ব্যক্তিজীবনে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সাকিব আল হাসান গত মার্চে শ্রীলংকার সঙ্গে টেস্ট খেলেছিলেন। সেই প্রথম, ঐটাই শেষ। আর সাদা পোশাকের ক্রিকেটে তাকে দেখা যায়নি। চোখের দৃষ্টিশক্তির সমস্যাটা এখনো কাটেনি। ছাত্র জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের ফলে সংসদ সদস্য পদ হারান মি. অলরাউন্ডার। কানাডা থেকে সরাসরি পাকিস্তানে গিয়ে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর তাকে নিয়ে ছড়িয়েছে স্ক্যান্ডাল। এসবের মাঝে ক্রিকেটে তার মনোযোগ ধরে রাখাটাই এখন মুখ্য বিষয়।
লিটন দাসের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। যদিও উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসেবে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ও তরুণ জাকির হাসান দলে আছেন। দলের প্রয়োজনের সময় অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়ে বাজে শট খেলে আউট হওয়াকে নিয়ম বানিয়ে ফেলা লিটন চলতি বছর চার ইনিংসে করেছেন ৬৭ রান। সমান ইনিংস খেলে তার তুলনায় খানিকটা ভদ্রস্থ দেখায় জাকিরের পরিসংখ্যান, ২৫.২০ গড়ে এক ফিফটিসহ ১০১ রান।
২০২৪ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলার অপেক্ষায় থাকা মুশফিকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার অভিজ্ঞতা, ব্যাটিং গড় ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে বহুবার খেলেছেন কার্যকরী ইনিংস। ৩৭ এর উপরে গড়ে ৫,৬৭১ রানের মালিক মি. ডিপেন্ডেবলের উপর ব্যাটিং অর্ডারের নির্ভরশীলতাটা থাকছেই।
পাকিস্তানের শক্তিশালী পেস আক্রমণের পাশাপাশি লেগ স্পিনার আবরারকে খেলাটা বাংলাদেশের জন্য কতটা কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। জয়ের মানসিকতা নাকি আদিকালের সম্মানজনক পরাজয় মেনে নিয়ে টেস্ট পাঁচদিনে নিয়ে যাওয়ার পুরনো কৌশলে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শিষ্যরা খেলবে, সেই ধুম্রজাল কাটেনি। পালহীন নৌকার দিশেহারা নাবিকের সঙ্গে তুলনাটা হয়তো অযৌক্তিক নয়।
টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ২৪ বছর হয়ে গেলেও ফরম্যাটটিতে এখনো যোগ্য দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতা সাদা পোশাকের ক্রিকেটে নিয়মিত চিত্র। মিরপুরের নিচু বাউন্স ও ধীরগতির উইকেটে খেলে অভ্যস্ত টাইগাররা অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারানোর মতো বিচ্ছিন্ন সাফল্য পেলেও আফগানিস্তানের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের লজ্জায় ডোবার ইতিহাসও টিম টাইগার্সের রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে পাকিস্তানকে চমকে দেওয়ার সম্ভাবনার আশার আলোটা তাই চোখে পড়ছে না। খেলোয়াড়দের ইতিবাচক মানসিকতা ও শেষ মুহূর্তে অনুশীলনের মাধ্যমে কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে পারলে ইতিবাচক পারফরম্যান্সটা দেখা যেতেও পারে। টেস্ট স্কোয়াডে থাকা অনেকে এ দলের হয়ে পাকিস্তানে খেলছেন। সেই অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগাতে পারার মানসিকতা তাদের ভেতর থাকাটা জরুরি।