ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে উদিত রবির আলো ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবির্ভাবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। ষষ্ঠ বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্ট অভিষেকে পাঁচ উইকেট শিকার করেন।
ক্যারিয়ারকে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টেনে নিয়ে গেলেও টিম কম্বিনেশনের কারণে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেতে পারেননি পর্যাপ্ত ম্যাচ। তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই বল হাতে বারবার জ্বলে উঠেছেন।
.png)
২০১৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজের প্রথমটিতে জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় ইনিংস ধসিয়ে দেন একা। স্পিনভেল্কি দেখিয়ে ১৬.৫ ওভারে মাত্র ৩৯ রান খরচায় তুলে নেন ৮ উইকেট। লাল বলের ক্রিকেটে এটি এখনো টাইগারদের এক ইনিংসে সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড।
শ্রীলংকার রঙ্গনা হেরাথ (৯/১২৭) এবং ইংল্যান্ডের জনি ব্রিগস (৮/১১) ছাড়া আর কোনো বাঁহাতি বোলারের টেস্টে তাইজুলের চেয়ে ভালো ফিগারের কীর্তি নেই।
বাংলাদেশ তো বটেই, ক্রিকেট ইতিহাসের পাতাতেও ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বরকে তিনি চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। ওয়ানডে ফরম্যাটে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক পাওয়া সর্বপ্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নিজের নাম লেখান। অনন্য সেই কীর্তির পরও এক দশকের পথচলায় টাইগারদের হয়ে ২০টির বেশি একদিনের ম্যাচ খেলতে পারেননি তিনি।
২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্কোয়াডে ছিলেন তাইজুল। যদিও একটির বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি তিনি।
বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আসতে তাইজুলকে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল। ২০১৯ সালের জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া ত্রিদেশীয় টি-২০ টুর্নামেন্ট প্রথম টি-২০ খেলেন তিনি। ১৩ সেপ্টেম্বর টি-২০ অভিষেকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নাটোরে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটার প্রথম ডেলিভারিতেই উইকেট পান। দুইদিন পর তিনি আফগানদের সঙ্গেও স্বাগতিকদের হয়ে খেলেছিলেন। অবাক করা তথ্য, এই দুই ম্যাচের পর তাইজুল লাল-সবুজের জার্সিতে আর কখনো টি-২০ ফরম্যাটে খেলার সুযোগ পাননি।
বিশেষজ্ঞ স্পিনার হিসেবে টেস্টে অটো চয়েজ হলেও বিদেশের মাটিতে অধিকাংশ সময় তিনি ব্রাত্যই থেকেছেন। স্পিনবান্ধব ও ধীরগতি উইকেট ছাড়া তাইজুল তেমন চলে না- এমন তত্ত্ব দেশের ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত। বৈচিত্রময় স্পিনার না হওয়াতেই যেন তার গায়ে তারকার তকমাটা কখনোই লাগেনি। নেই কোনো ভক্তকূল, থাকেননি লাইমলাইটে। নিজের কাজটা অবিরাম ঠিকঠাক চালিয়ে গেছেন।
আরাফাত সানি, মোসাদ্দেক হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ, আফিফ হোসেন, শেখ মেহেদী হাসান, আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, নাসুম আহমেদ, রিশাদ হোসেনের মতো স্পিনারদের কারণে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কখনোই পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি তাইজুল। এটি নিয়ে অবশ্য ক্রিকেটীয় বিতর্কও তেমন নেই। বোলিংয়ে অবিরাম লাইন ও লেন্থ বজায় রাখাটাই তার বড় অস্ত্র। টার্ন করাতে পারেন বটে, তবে চোখের দেখায় বৈচিত্র না থাকাটা হয়তো সাদা বলে তার অনিয়মিত হয়ে পড়ার বড় একটি কারণ।
টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে তকমাটা যেন তার ক্রিকেটীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশই হয়ে গিয়েছে। ৫১ ম্যাচে তার উইকেটসংখ্যা ২১৭। লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বাধিক উইকেটশিকারি। তার উপরে শুধুই ২৪৬ উইকেট পাওয়া সাকিব আল হাসান। ওয়ানডেতে ২০ ম্যাচে ৩১ ও টি-২০-তে একটি উইকেট তার ঝুলিতে আছে।
বিদেশের মাটিতে তাইজুল কার্যকর নন, বহুল প্রচলিত এমন মতবাদ আপাতত টিকছে না। একে তো সুযোগটা পেয়েছেন কম, তার উপর জ্যামাইকার সাবিনা পার্কের কঠিন বাউন্সি কন্ডিশনেও বাংলাদেশের জয়ের নায়ক হয়ে দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো ম্যাচসেরার পুরস্কারও পেয়ে গিয়েছেন।
জ্যামাইকা টেস্টের শেষ ইনিংসে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেন তাইজুল। এটা তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৫তম পাঁচ উইকেট শিকার। এছাড়া ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ১৩০ মিনিট ক্রিজে কাটান, দ্বিতীয় ইনিংসে ৮০ মিনিট। বড় ইনিংস খেলতে না পারলেও তার ৬৬ বলে ১৬ ও ৫০ বলে ১৪ রানের ইনিংস দুটি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুই বিভাগে ভূমিকা রাখাতেই তাকে ম্যাচসেরা হিসেবে বেছে নেয়া হয়। ১৫ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। যার মূল কৃতিত্ব অবধারিতভাবেই তাইজুলের প্রাপ্য।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টাইগারদের পেস আক্রমণ নিয়ে চলছে ভূয়সী প্রশংসা। তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা, হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলামের হাত ধরে ফাস্ট বোলিং ডিপার্টমেন্টে যেন ঘটে গেছে নতুন বিপ্লব। তাদের নিয়ে আলোড়নের মাঝে স্বল্প সময়ে আলোচিত থাকলেও পরে যেন খানিকটা আড়ালেই রয়ে যান তাইজুল।
ক্যারিয়ারে বিতর্ক কখনো স্পর্শ না করলেও সম্প্রতি তার একটি মন্তব্যকে নিয়ে হয়েছিল ট্রল। কদিন আগে নাজমুল হোসেন শান্ত যখন তিন ফরম্যাটে নেতৃত্ব ছাড়ার আভাস দেন, তখন তাইজুল বলেছিলেন তিনি অধিনায়ক হতে পুরোটাই প্রস্তুত।
নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘যেহেতু ১০ বছর ক্রিকেট খেলছি তো পুরোটাই তৈরি! যদি ব্যক্তিগতভাবে বলেন, ইম্প্লিমেন্ট করতে পারি। কিন্তু আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, আপনি কতটুকু নিচ্ছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা সতীর্থ হিসেবে হোক আর সেটা আমার দেশের জনগণ হোক।’
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪৭১ উইকেট লিস্ট এ ক্রিকেটে ১৭৮ ও সব ধরনের স্বীকৃত ক্রিকেটে ৮৫ উইকেট পাওয়া তাইজুল ১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন। কাকতালীয়ভাবে তার সপ্তম জন্মদিনের দিন টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে এক ইনিংসে ১০ উইকেট দখল করেছিলেন কিংবদন্তি স্পিনার অনিল কুম্বলে।
টাইগার ক্রিকেটে হয়তো কিংবদন্তিদের তালিকায় তাইজুলের নাম থাকা নিয়ে থাকবে সংশয়। তবে ইতিহাসটা লিখতে গেলে তাকে বাদ দিয়ে সেটি রচিত হওয়া কার্যত অসম্ভব। মেঘের আড়ালে থাকা রবি যেন কখনো উঁকি দিয়ে যেমন বার্তা দেয়, আমি অস্তিত্বহীন নই। ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উদিত হওয়া তাইজুল যেন তার জলন্ত দৃষ্টান্ত।